আজ সকালে অফিসে যাওয়ার পথে একটা বিল্ডিংয়ের সিঁড়ি দেখে আমার জীবনের কথা মনে পড়ল। আমি কত বছর ধরে উঠছি, কিন্তু কখনো উপরে পৌঁছাতে পারি না।
চাকরি পেলাম। মনে হলো এবার সব ঠিক হয়ে যাবে। তিন মাস পর চাকরি গেল। আবার সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে। নতুন চাকরি খোঁজা। নতুন আশা। নতুন স্বপ্ন। তারপর আবার সেই একই পরিণতি।
আমার জীবনটা যেন একটা অদ্ভুত সিঁড়ি। প্রতিটা ধাপ উঠি আশা নিয়ে। মনে হয় এবার উপরে পৌঁছে যাব। কিন্তু একসময় দেখি আমি আবার নিচেই দাঁড়িয়ে আছি।
আর্থিক অবস্থা একটু ভালো হয়। ভাবি এবার পরিবারকে ভালো কিছু দিতে পারব। হঠাৎ কোনো জরুরি খরচ এসে সব শেষ। আবার সেই পুরনো সংগ্রাম।
হ্যাপির সাথে সম্পর্ক মাঝে মাঝে ভালো হয়। মনে হয় এবার আমরা খুশি হতে পারব। কিন্তু কিছুদিন পরই আবার সেই পুরনো দূরত্ব। কেন জানি আমরা কাছে আসতে পারি না।
আরাশের পড়ালেখা নিয়ে আশা করি। ভাবি এই ছেলেটা আমার চেয়ে এগিয়ে যাবে। কিন্তু এই সমাজে ও-ও কি সেই একই সিঁড়িতে আটকে যাবে?
আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি। মনে হয় হয়তো এবার আমার দোয়া কবুল হবে। জীবনে একটু শান্তি আসবে। কিন্তু দিনের শেষে দেখি আমি সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে।
এই সিঁড়িতে উঠতে গিয়ে আমি অনেক মানুষকে দেখেছি। সবাই একই রকম ক্লান্ত। সবাই একই রকম হতাশ। সবাই ভাবে এবার উপরে উঠতে পারবে। কিন্তু কেউ পারে না।
মাঝে মাঝে ভাবি, এই সিঁড়ির উপরে আসলে কিছু আছে নাকি? নাকি আমরা শুধু একটা মায়ার পেছনে দৌড়াচ্ছি?
এই সিঁড়িতে প্রতিদিন নতুন মানুষ আসে। তারা ভাবে তারা নতুন। তাদের ভাগ্য ভালো। তারা উঠতে পারবে। কিন্তু কিছুদিন পরই তারাও বুঝতে পারে এটা একটা চক্র।
আমার বন্ধু জামিউল একবার বলেছিল, “হায়দার, তুই এত চেষ্টা কেন করিস? দেখতে পাচ্ছিস না সব বৃথা?” আমি বলেছিলাম, “তাহলে কি করব? বসে থাকব?”
কিন্তু এখন মনে হয় জামিউল হয়তো ঠিকই বলেছিল। আমি যতই চেষ্টা করি, যতই উঠার চেষ্টা করি, শেষে আবার সেই একই জায়গায়।
আরাশ মাঝে মাঝে আমাকে জিজ্ঞেস করে, “আব্বু, আপনি কেন এত কষ্ট করেন? আমরা তো ভালোই আছি।” আমি হাসি দিয়ে বলি, “হ্যাঁ, ভালোই তো।”
কিন্তু আসলে আমি জানি আমরা ভালো নেই। আমরা শুধু অভ্যস্ত হয়ে গেছি এই সিঁড়িতে উঠা-নামার সাথে।
হ্যাপি বলে, “তুমি এত চিন্তা কেন করো? যা আছে তাতেই খুশি থাকো।” কিন্তু আমি পারি না। আমি জানি এর চেয়ে ভালো কিছু হওয়া সম্ভব। শুধু এই সিঁড়িটা যদি সত্যিই উপরে যেত।
সবচেয়ে কষ্টের কথা হলো, এই সিঁড়িতে আমি একা নই। আমার সাথে আছে হ্যাপি, আছে আরাশ। তারাও এই চক্রে আটকে আছে আমার কারণে।
আমি ভাবি, আল্লাহ কেন এমন সিঁড়ি বানিয়েছেন? মানুষ উঠতে চাইবে, কিন্তু উঠতে পারবে না। স্বপ্ন দেখবে, কিন্তু স্বপ্ন পূরণ হবে না।
নাকি এটাই পরীক্ষা? যে কতক্ষণ এই সিঁড়িতে উঠতে থাকতে পারি হাল না ছেড়ে?
কিন্তু পরীক্ষারও তো একটা শেষ থাকে। এই পরীক্ষার শেষ কোথায়?
রাতে ঘুমানোর আগে ভাবি, আগামীকাল আবার এই সিঁড়িতে উঠতে হবে। আবার আশা নিয়ে। আবার স্বপ্ন নিয়ে। জানি যে আবার নিচে নেমে আসতে হবে। তবুও উঠতে হবে।
কারণ থেমে গেলে তো মরে যাওয়া। আর এই উঠতে থাকাটাই হয়তো জীবন। যদিও উপরে কিছু নেই।
একটু ভাবনা রেখে যান