ব্লগ

উপস্থিত অনুপস্থিতি

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আজ সকালে অফিসের একটা জরুরি মিটিং ছিল। জুম-এ। আমরা দশজন একসাথে স্ক্রিনে। সবাই “present” কিন্তু কেউই “উপস্থিত” না। বস কথা বলছে, আমি তাকিয়ে আছি তার দিকে, কিন্তু আমার মন আছে ব্যাংকের লোনের চিন্তায়। পাশের সহকর্মী ক্যামেরা অন করে বসে আছে, কিন্তু তার চোখ অন্য স্ক্রিনে – হয়তো ফেসবুক ব্রাউজ করছে।

মিটিং শেষে ভাবলাম – আমরা সবাই ছিলাম, কিন্তু কেউই ছিলাম না।

বাড়ি এসে দেখি আরাশ তার বন্ধুদের সাথে “অনলাইন স্টাডি গ্রুপ” করছে। স্ক্রিনে পাঁচটা মুখ। সবাই বই নিয়ে বসে আছে, কিন্তু কেউ পড়ছে না। গল্প করছে।

“তোমাদের পড়া হচ্ছে?”

“হ্যাঁ বাবা। আমরা একসাথে পড়ি।”

“কিন্তু তোমরা তো গল্প করছো।”

আরাশ একটু লজ্জা পেয়ে বলল, “বাবা, একা পড়তে মন বসে না। ওদের সাথে থাকলে লাগে আমি একা নই।”

আমার ভিতরে একটা অ্যাপ খুলে গেল যার নাম “সঙ্গের নতুন সংজ্ঞা ভার্সন কোভিড পরবর্তী”।

হ্যাপির সাথে রাতে কথা বলছিলাম। “তোর কি মনে হয় ভার্চুয়াল মিটিং-এ আমরা আসলেই একসাথে থাকি?”

“কেমন মানে?”

“মানে, স্ক্রিনে দেখি সবাইকে। কিন্তু লাগে না আমরা একই রুমে আছি।”

হ্যাপি বলল, “হায়দার, গতকাল আমার বোনের সাথে ভিডিও কলে কথা হলো। তিন ঘণ্টা কথা বললাম। মনে হচ্ছিল আমরা পাশাপাশি বসে আছি। কিন্তু কল শেষ করার পর হঠাৎ লাগল আমি একদম একা।”

“তাহলে?”

“তাহলে ভার্চুয়াল মিটিং-এ আমরা মানসিকভাবে উপস্থিত থাকি, কিন্তু শারীরিকভাবে অনুপস্থিত।”

পরদিন অফিসে জামিউরের সাথে এই নিয়ে কথা বলছিলাম। “ভার্চুয়াল মিটিং-এ তোমার কেমন লাগে?”

“আজব একটা অনুভূতি, ভাই। মনে হয় আমি দুই জায়গায় একসাথে আছি। ঘরে বসে আছি, কিন্তু অফিসের মিটিং-এও আছি।”

“কিন্তু কোথায় বেশি?”

“সেটাই সমস্যা। পুরোপুরি কোথাও নেই।”

রাতে নামাজ পড়ে ভাবছিলাম। আল্লাহর সাথে আমার যোগাযোগ কি ভার্চুয়াল? আমি এখানে, তিনি আরশে। কিন্তু যখন দোয়া করি, মনে হয় তিনি এখানেই আছেন। এই উপস্থিতি কি আসল নাকি নকল?

আরাশকে বললাম, “তুই যখন অনলাইনে তোর বন্ধুদের সাথে পড়িস, তখন কি আসলেই তোদের একসাথে পড়া হয়?”

“বাবা, শারীরিকভাবে আমরা আলাদা। কিন্তু মানসিকভাবে আমরা একসাথে। এই togetherness টা আসল।”

“কিন্তু পড়াটা?”

আরাশ হেসে বলল, “পড়াটা অজুহাত। আসল উদ্দেশ্য একসাথে থাকা।”

আমি বুঝলাম। ভার্চুয়াল মিটিং-এ আমরা যা খুঁজি, সেটা তথ্য আদানপ্রদান নয়। খুঁজি মানবিক সংযোগ। কিন্তু স্ক্রিনের মাধ্যমে সেই সংযোগ অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

আমার বাবার সাথে যখন কথা বলতাম, তিনি আমার চোখে তাকিয়ে কথা বলতেন। কিন্তু ভার্চুয়াল মিটিং-এ আমি ক্যামেরায় তাকাই, স্ক্রিনে তাকাই – কখনো মানুষের চোখে তাকাই না।

হয়তো এইটাই সমস্যা। ভার্চুয়াল মিটিং-এ আমরা একে অপরের ইমেজ দেখি, কিন্তু soul-to-soul connection হয় না।

কিন্তু তার মানে এই নয় যে ভার্চুয়াল মিটিং অর্থহীন। আরাশ যেমন বলেছে, togetherness টা আসল। একাকীত্ব কমানোর জন্য এটা কাজ করে।

আসল উপস্থিতি শুধু শারীরিক নয়। মানসিক উপস্থিতিও দরকার। ভার্চুয়াল মিটিং-এ আমরা শারীরিকভাবে অনুপস্থিত, কিন্তু মানসিকভাবে উপস্থিত থাকতে পারি – যদি আমরা সচেতনভাবে attention দিই।

সমস্যা হলো, আমরা প্রায়ই ভার্চুয়াল মিটিং-এ multitask করি। শরীর একজায়গায়, মন আরেকজায়গায়।

প্রকৃত উপস্থিতি হলো undivided attention। সেটা ভার্চুয়াল হোক বা ফিজিক্যাল, সচেতনভাবে present থাকতে হয়।

হয়তো ভার্চুয়াল মিটিং-এ আসল উপস্থিতির অনুপস্থিতি আমাদের সমস্যা নয়। আমাদের মনোযোগের অভাবই সমস্যা।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *