লিফট বন্ধ হলো। আমি একা। আয়নায় নিজের মুখ দেখি। ক্লান্ত। বুড়ো হয়ে গেছি।
পঞ্চম তলা। চতুর্থ তলা। তৃতীয় তলা।
কত বছর চাকরি করছি? পনেরো বছর। কত বেতন পেয়েছি এতে? কত টাকা? হিসাব করতে গেলে মাথা ঘুরে যায়।
দ্বিতীয় তলা। প্রথম তলা।
পনেরো বছর আগে যখন প্রথম চাকরি শুরু করেছিলাম, মনে হয়েছিল সব পেয়ে গেছি। বেতন ছিল আট হাজার টাকা। আট হাজার! তখন মনে হয়েছিল কোটিপতি হয়ে গেছি।
গ্রাউন্ড ফ্লোর।
এখন বেতন তিরিশ হাজার। কিন্তু কেন মনে হয় আগের চেয়ে গরীব? আগে আট হাজারে সংসার চলতো। এখন তিরিশ হাজারে চলে না।
লিফট খুলল। বের হলাম।
গতকাল রাতে হিসাব করেছিলাম। বাড়ি ভাড়া পনেরো হাজার। বিদ্যুৎ বিল দুই হাজার। গ্যাস বিল এক হাজার। আরাশের স্কুলের বেতন তিন হাজার। খাবার দশ হাজার। মিলিয়ে একত্রিশ হাজার। আর আমার বেতন তিরিশ হাজার।
ব্যাংকে ঋণ পনের লাখ। প্রতি মাসে কিস্তি পনের হাজার। কিন্তু সেই টাকা কোথায়?
রাস্তায় হাঁটতে লাগলাম। মানুষ দেখি। সবার মুখে হাসি। তারা কি খুশি? নাকি আমার মতো ভান করছে?
ওই লোকটা দেখি। দামী গাড়িতে। সে কি খুশি? নাকি তারও ঋণ আছে? তারও রাতে ঘুম আসে না?
আগে মনে হতো, টাকা থাকলে সব সমস্যার সমাধান। এখন বুঝি, টাকা থাকলে নতুন সমস্যা। টাকা না থাকলেও সমস্যা।
বাসে উঠলাম। ভাড়া বিশ টাকা। আগে ছিল পাঁচ টাকা। সবকিছু বেড়েছে। শুধু আমার যোগ্যতা বাড়েনি।
জানালা দিয়ে তাকালাম। দেখি এক ভিখারি। তার মুখে কোনো চিন্তা নেই। আমার চেয়ে সে কি বেশি শান্তি?
হ্যাপি ফোন করল। “কখন আসবে?”
“আসছি।” বললাम।
“আজ মাছ কিনেছি। তোমার পছন্দের রুই মাছ।”
রুই মাছ। এক কেজি ছয়শো টাকা। আগে ছিল পঞ্চাশ টাকা। ইচ্ছে করে বলি, “মাছ না খেলেও চলবে।” কিন্তু বলতে পারি না।
“ভালো।” বললাম।
ফোন কেটে দিলাম। বাইরে অন্ধকার নামছে। আমার ভিতরেও অন্ধকার।
পনেরো বছর চাকরি। আর কত বছর? দশ বছর? বিশ বছর? মৃত্যু পর্যন্ত? এভাবেই কাটবে? হিসাব মিলিয়ে মিলিয়ে?
বাস থেমে গেল। ট্রাফিক জ্যাম। আটকে গেছি। জীবনও আটকে গেছে। এগোতে পারছি না। পিছনেও যেতে পারছি না।
শুধু অপেক্ষা। কত অপেক্ষা! কবে এই জ্যাম ছাড়বে? কবে জীবনের জ্যাম ছাড়বে?
একটু ভাবনা রেখে যান