ব্লগ

উৎসবের রঙে

নভেম্বর ২০২৫ · 5 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আজ ঈদের দিন। সকাল থেকেই পাড়ায় উৎসবের আমেজ। মসজিদ থেকে তাকবীরের আওয়াজ ভেসে আসছে। বাচ্চারা নতুন জামাকাপড় পরে রাস্তায় দৌড়াদৌড়ি করছে।

আমি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দেখছি। মনে একটা তিক্ততা। এবারে নতুন কিছু কেনার পয়সা নেই। আরাশকে একটা শার্ট কিনে দিয়েছি। হ্যাপির জন্য একটা শাড়ি। আমার জন্য কিছু নেই।

কিন্তু এই তিক্ততার মধ্যেও একটা টান অনুভব করছি। উৎসবের টান। যেন আমার ভেতরের কোনো আদিম অংশ জেগে উঠেছে। যেটা বলছে—আজ দুঃখ নয়, আজ আনন্দ।

আরাশ এসে বলল, “বাবা, চলো ঈদগাহে।” নতুন পাঞ্জাবি পরে সে দেখতে কত সুন্দর। আমার বুকে গর্বের একটা ঢেউ খেলে গেল।

“চলো,” আমি বললাম।

ঈদগাহে যাওয়ার পথে দেখলাম—সবার মুখে হাসি। ধনী-গরিব সবাই একসাথে হাঁটছে। আজ যেন কোনো ভেদাভেদ নেই। সবাই একই উৎসবে মাতোয়ারা।

আমি ভাবলাম—এই উৎসব কী? শুধু একটা দিন? নাকি মানুষের ভেতরে লুকিয়ে থাকা আনন্দের বাঁধ ভেঙে যাওয়া?

ঈদগাহে পৌঁছে দেখি—হাজার হাজার মানুষ। সবাই একসাথে নামাজ পড়ছে। এই যে একসাথে থাকা, একসাথে দাঁড়ানো—এতে একটা অদ্ভুত শক্তি আছে।

নামাজ শেষে সবাই কোলাকুলি করছে। “ঈদ মুবারক,” “ঈদ মুবারক।” এই শব্দটা বারবার শুনতে শুনতে মনে হল—আজ সবাই ভাই। সবাই এক।

একজন অচেনা মানুষ এসে আমাকে কোলাকুলি করল। “ঈদ মুবারক ভাই।” আমিও বললাম, “আপনারও ঈদ মুবারক।” এই একটা মুহূর্তে আমরা অচেনা ছিলাম না। আমরা ছিলাম দুই ভাই।

আরাশ আমার হাত ধরে বলল, “বাবা, এত মানুষ!” আমি বললাম, “হ্যাঁ। আর সবাই খুশি।” “তুমিও খুশি?” আমি তাকিয়ে দেখলাম আরাশের মুখে সেই নির্মল হাসি। আমার চোখে পানি এসে গেল।

“হ্যাঁ,” আমি বললাম। “আমিও খুশি।”

আর সত্যিই খুশি লাগছিল। আমার কোনো চাকরি নেই, পকেটে টাকা নেই। কিন্তু আজ এসব ছোট মনে হচ্ছে। আজ আমার আছে আরাশের হাত। হ্যাপির ভালোবাসা। আর এই উৎসবের আমেজ।

বাসায় ফিরে দেখি—হ্যাপি সেমাই রান্না করেছে। ঘরে মিষ্টি গন্ধ। “কেমন লাগল?” সে জিজ্ঞেস করল। “ভালো,” আমি বললাম। “আজ মনে হচ্ছে—আমি একা নই।”

দুপুরে আত্মীয়রা এলো। দূর থেকে এসেছে অনেকে। আমি একটু সংকোচে ছিলাম। তারা জানে আমার অবস্থা খারাপ। কিন্তু দেখলাম—কেউ কিছু বলছে না। সবাই আনন্দে মেতে আছে।

আরাশ সবার সাথে খেলছে। তার খুশির চিৎকার শুনে আমার মনে হল—এই একটা দিনের জন্য সারা বছরের কষ্ট সহ্য করা যায়।

সন্ধ্যায় পাড়ার ছেলেরা ফুটবল খেলার আয়োজন করল। আমাকেও ডাকল। প্রথমে রাজি হইনি। বয়স হয়ে গেছে, শরীর নেই। কিন্তু সবার জেদে শেষে খেললাম।

মাঠে নেমে প্রথমে অস্বস্তি লাগছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই পুরনো উৎসাহ ফিরে এলো। বল পায়ে নিয়ে দৌড়ালাম। বয়স ভুলে গেলাম। সমস্যা ভুলে গেলাম।

খেলা শেষে সবাই হেসে পড়ে আছি। ঘামে নেয়ে গেছি। কিন্তু মন ভালো। সাইফুল বলল, “হায়দার, তুই এখনো পারিস।” জামিউর বলল, “আমরা সবাই একসাথে খেলেছি কত বছর পর।”

আমি বুঝলাম—উৎসব শুধু খাওয়া-দাওয়া নয়। উৎসব হলো একসাথে থাকা। একসাথে আনন্দ করা। একসাথে ভুলে যাওয়া যে আমাদের কত সমস্যা আছে।

রাতে বাসায় ফিরে হ্যাপি বলল, “তোমাকে আজ কত খুশি লাগছে।” আমি বললাম, “আজ বুঝেছি—আনন্দ টাকায় কেনা যায় না।” “তাহলে কীভাবে পাওয়া যায়?” “ভাগাভাগি করে।”

আরাশ এসে আমার কোলে বসল। “বাবা, আজ খুব মজা হয়েছে।” “কী মজা?” “সবাই একসাথে ছিলাম।” আমি তাকে জড়িয়ে ধরলাম। এই সহজ সত্যটা আরাশ বুঝে গেছে।

আমি ভাবলাম—আমি কত মানুষের সাথে মিশেছি আজ। অচেনা মানুষের সাথে কোলাকুলি করেছি। পুরনো বন্ধুদের সাথে খেলেছি। পরিবারের সাথে সময় কাটিয়েছি।

এই যে মেলামেশা, এই যে একসাথে থাকা—এটাই হয়তো মানুষের মূল প্রকৃতি। আমরা একা থাকার জন্য তৈরি হইনি। আমরা তৈরি হয়েছি একসাথে থাকার জন্য।

কিন্তু প্রতিদিন এই একসাথে থাকা হয় না। প্রতিদিন আমরা আলাদা আলাদা লড়াই করি। আলাদা আলাদা দুঃখে ডুবে থাকি। তাই উৎসব দরকার। যে দিনে আমরা ভুলে যাই যে আমরা আলাদা।

শুয়ে শুয়ে ভাবলাম—আজকের এই আনন্দ আমি মনে রাখবো। যখন আবার কষ্ট আসবে, যখন আবার একা লাগবে, তখন মনে করবো আজকের কথা। মনে করবো যে আমি একা নই। আমার সাথে আছে অনেক মানুষ।

আর এই অনুভূতিই হয়তো উৎসবের আসল উপহার।

এই যে আজ সবার সাথে মিলে আনন্দ করলাম—এটা শুধু একটা দিনের ঘটনা নয়। এটা আমার ভেতরে একটা বীজ বুনে দিয়েছে। যেটা বলছে—তুমি একা নও। তোমার চারপাশে অনেক মানুষ আছে যারা তোমার মতোই আনন্দ খোঁজে। তোমার মতোই দুঃখ পায়। তোমার মতোই স্বপ্ন দেখে।

আর এই উপলব্ধিটাই হয়তো সবচেয়ে বড় উৎসব।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *