আমাদের এলাকার বড় খানকা শরিফের পীর সাহেবের ইন্তেকাল হয়েছে। আজ তার ছেলেকে নতুন পীর হিসেবে ঘোষণা দেয়া হলো। আমি ভাবি – পীর হওয়াও কি বাবার সম্পত্তির মতো ছেলের কাছে যায়?
ঘোষণার অনুষ্ঠানে গেছি। দেখি হাজার হাজার মানুষ। নতুন পীর সাহেব মাত্র ২৮ বছর বয়স। আমেরিকায় MBA করেছেন। তার বক্তৃতা শুনছি – “আমার আব্বাজানের রুহানি শক্তি আমার মধ্যে এসেছে।”
আমি মনে মনে প্রশ্ন করি – রুহানি শক্তি কি DNA তে থাকে?
পাশে বসা একজন ভক্ত বলেন, “মাশাল্লাহ! বাবার মতোই জ্ঞানী।” আমি জিজ্ঞেস করি, “আপনি কিভাবে বুঝলেন?” তিনি বলেন, “ওনার পিতার রক্তে সেই ক্ষমতা।”
আমি ভাবি – তাহলে নবীজি (সা.) এর ছেলেরা কেন নবী হলেন না?
বাড়ি ফিরে আরাশ জিজ্ঞেস করে, “আব্বু, পীর মানে কী?” আমি বলি, “যিনি মানুষকে আল্লাহর পথ দেখান।” আরাশ বলে, “তাহলে বাবার মৃত্যুর পর ছেলে কিভাবে পীর হয়? পীর হওয়া কি চাকরির মতো?”
আমার মুখে হাসি চলে আসে। ১১ বছরের বাচ্চার প্রশ্ন আমার চেয়ে ভালো।
আমি ফেসবুকে দেখি নতুন পীর সাহেবের ছবি। BMW গাড়িতে করে খানকায় আসছেন। কমেন্টে লেখা – “পীর সাহেবের শান!” আমি ভাবি – আধ্যাত্মিকতা কি BMW এর শোরুমে পাওয়া যায়?
হ্যাপি বলে, “তুমি সব সময় কেন সন্দেহ করো?” আমি বলি, “আমি জানতে চাই – ধর্মীয় নেতৃত্ব কি যোগ্যতার ভিত্তিতে হবে, নাকি বংশের ভিত্তিতে?”
আমি গুগলে সার্চ করি। দেখি বাংলাদেশের প্রায় সব বড় পীর, হুজুর, মুফতিদের ছেলেরা একই পেশায়। কোনো পরীক্ষা নেই, কোনো যোগ্যতা নিরূপণ নেই।
আমি মনে করি – যদি আমি ডাক্তার হতে চাই, MBBS করতে হবে। ইঞ্জিনিয়ার হতে চাই, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে হবে। কিন্তু পীর হতে চাই, শুধু পীরের ছেলে হলেই হবে?
আমি একটা মাদ্রাসার ঘটনা মনে করি। প্রিন্সিপাল সাহেবের মৃত্যুর পর তার ১৯ বছরের ছেলে প্রিন্সিপাল হয়েছে। অথচ তার কোনো ডিগ্রি নেই, কোনো অভিজ্ঞতা নেই।
আরাশ বলে, “আব্বু, আমাদের ক্লাস টিচার বলেছেন মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নেতা হতে হয়। তাহলে ধর্মীয় নেতারা কেন এর ব্যতিক্রম?”
আমি উত্তর দিতে পারি না।
আমি ইউটিউবে একটা পুরনো ভিডিও দেখি। সেই পীর সাহেবের বাবা বলছেন, “আধ্যাত্মিকতা বংশে আসে না। এটা আল্লাহর দান।” কিন্তু তার ছেলে নিজেই বলছে, “বাবার আধ্যাত্মিক শক্তি আমার ভেতরে।”
বিপরীতধর্মী কথা!
আমি একটা হাদিস মনে করি – “আরব হওয়ার কারণে কারো কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই।” তাহলে পীরের ছেলে হওয়ার কারণে কেন শ্রেষ্ঠত্ব?
হ্যাপি বলে, “হয়তো তারা বাবার কাছে ভালো শিক্ষা পেয়েছে।” আমি বলি, “তাহলে সেই শিক্ষার পরীক্ষা নিন। সবার সামনে যোগ্যতা প্রমাণ করুন।”
আমি একটা খবর দেখি। এক খানকায় দুই ভাইয়ের মধ্যে পীর হওয়া নিয়ে লড়াই। একজন বলছেন তিনি বড় তাই তার হক। অন্যজন বলছেন তিনি বেশি শিক্ষিত তাই তার হক।
আমি ভাবি – আধ্যাত্মিকতা কি সম্পত্তির মতো ভাগ-বাটোয়ারার বিষয়?
রাতে একটা স্বপ্ন দেখি। কেয়ামতের দিনে আল্লাহ প্রশ্ন করছেন, “তুমি কিভাবে নেতা হলে?” একজন বলেন, “আমার যোগ্যতা ছিল।” আরেকজন বলেন, “মানুষ আমাকে পছন্দ করেছে।”
তৃতীয়জন বলেন, “আমার বাবা পীর ছিলেন।”
আল্লাহ বলেন, “তুমি নিজে কী করেছো?”
সে উত্তর দিতে পারে না।
সকালে আমি কোরআন পড়ি। দেখি আল্লাহ বলেছেন – “আমি তোমাদের মধ্যে যিনি বেশি আল্লাহভীরু তাকে বেশি সম্মানিত করি।” জন্ম পরিচয়ের কথা নেই।
আমি আরেকটা আয়াত পড়ি – “প্রত্যেকে নিজের কাজের ফল পাবে।” বাবার কাজের ফল নয়।
আমি প্রশ্ন করি নিজেকে – আমরা কি এমন একটা সিস্টেম তৈরি করেছি যেটা ইসলামের মূল নীতির বিপরীত?
আরাশ এসে বলে, “আব্বু, আমি বড় হয়ে কী হবো?” আমি বলি, “তুমি যেটায় ভালো, সেটাতে।” সে বলে, “কিন্তু যদি আপনি পীর হতেন, তাহলে আমি কি পীর হতাম?”
আমি হেসে বলি, “তুমি যদি পীর হওয়ার যোগ্যতা রাখতে, তবেই।”
আরাশ বলে, “তাহলে অন্যরা কেন যোগ্যতা ছাড়াই পীর হয়?”
আমি বলি, “এইটাই তো সমস্যা।”
আয়নায় নিজের মুখ দেখি। ভাবি – আমি কি চাই আমার সন্তান যোগ্যতার ভিত্তিতে এগিয়ে যাক, নাকি আমার পদবীর ভিত্তিতে?
আমার মনে হয় ধর্মীয় নেতৃত্ব একটা রাজতন্ত্রে পরিণত হয়েছে। যেখানে সিংহাসন বংশানুক্রমে যায়, যোগ্যতার ভিত্তিতে নয়।
একটু ভাবনা রেখে যান