দরজায় কলিং বেল। হ্যাপির বোন এসেছে তার পরিবার নিয়ে। আমি তখন শুয়ে শুয়ে মোবাইলে ইউটিউব দেখছিলাম। হ্যাপি দ্রুত এসে বলল, “উঠ। অতিথি এসেছে।” এবং সেই মুহূর্ত থেকেই শুরু হয় আমার রূপান্তর। আমি আর আমি থাকি না। হয়ে যাই “ভালো ছেলে হায়দার”।
প্রথমেই পোশাক পরিবর্তন। বাড়ির আরামদায়ক শর্ট-গেঞ্জি ছেড়ে পরি ভদ্র শার্ট-প্যান্ট। চুল একটু আঁচড়ে নিই। মুখে একটা কৃত্রিম হাসি সাঁটিয়ে নিয়ে বেরিয়ে যাই বসার ঘরে।
“আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন?” আমার কণ্ঠস্বর হয়ে যায় মধুর। স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি বিনয়ী। অতিথিদের সাথে হাসিমুখে কথা বলি। জিজ্ঞেস করি তাদের অবস্থা, স্বাস্থ্য, কাজকর্মের কথা।
কিন্তু এই সবের মধ্যে একটা অদ্ভুত অভিনয় চলে। আমি যেন একটা চরিত্রে অভিনয় করছি। যে চরিত্র আমি নই। কিন্তু অতিথিদের কাছে যেমন মানুষ হিসেবে পরিচিত হতে চাই।
হ্যাপির বোন বলেন, “হায়দার ভাইয়া, আপনি তো খুব ভদ্র।” আমি হাসিমুখে বলি, “ধন্যবাদ।” কিন্তু মনে মনে ভাবি, “যদি তুমি দেখতে আমি ঘরে কেমন থাকি।”
চা-নাশতার ব্যবস্থা করি। অতিথিদের সেবা করি। “আরো নিন। পছন্দ হচ্ছে তো?” এসব কথা বলি। যদিও আমার স্বাভাবিক অভ্যাস এরকম নয়।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হয় আরাশের ব্যাপারে। বাড়িতে যে আরাশের সাথে আমার মাঝে মাঝে তর্ক-বিতর্ক হয়, সেই আরাশের সাথে অতিথিদের সামনে আমি হয়ে যাই আদর্শ বাবা।
“আরাশ, তোমার বই-খাতা দেখাও কাকুকে।” বলি খুব স্নেহের সাথে। আরাশ আমার দিকে অবাক চোখে তাকায়। সে জানে এটা আমার স্বাভাবিক ব্যবহার নয়।
অতিথিরা বলেন, “আরাশ তো খুব ভালো ছেলে।” আমি গর্বিত বাবার মতো বলি, “হ্যাঁ, পড়ালেখায় খুব ভালো।” অথচ বাড়িতে প্রায়ই তার পড়ালেখা নিয়ে চিন্তা করি।
এই অভিনয়ের কারণ কী? কেন আমি অতিথিদের সামনে অন্যরকম হয়ে যাই? হয়তো সামাজিক প্রত্যাশা। মানুষ আশা করে আমি একজন ভালো স্বামী, ভালো বাবা, ভালো মানুষ হব।
আর আমি সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে চাই। অতিথিরা যেন আমার পরিবার সম্পর্কে ভালো ধারণা নিয়ে যায়। হ্যাপির বোন যেন তার পরিবারে গিয়ে বলতে পারে, “আমার বোনের খুব ভালো সংসার।”
কিন্তু এই অভিনয় করতে করতে ক্লান্ত লাগে। স্বাভাবিক থাকতে ইচ্ছা করে। কিন্তু পারি না। সমাজ আমার কাছে একটা নির্দিষ্ট ব্যবহার আশা করে।
আল্লাহর কাছে প্রশ্ন করি, “এই যে অভিনয়, এটা কি ভণ্ডামি? নাকি সভ্যতার অংশ?” মনে হয় উত্তর আসছে – “সামাজিক শিষ্টাচারও একধরনের দায়িত্ব।”
অতিথিরা চলে যাওয়ার পর আমি আবার সেই পুরনো হায়দার হয়ে যাই। শার্ট খুলে রাখি। সোফায় গা এলিয়ে বসি। আরাশকে বকা দিই কোনো কিছুর জন্য।
হ্যাপি বলে, “তুমি অতিথিদের সামনে আর ঘরে একদম আলাদা মানুষ।” আমি বলি, “সবাই তো এরকম।” কিন্তু মনে মনে ভাবি, এটা কি ঠিক?
আরাশ একদিন বলেছিল, “আব্বু, আপনি অতিথিরা এলে খুব ভালো হয়ে যান।” তার এই নিষ্পাপ মন্তব্যে বুঝলাম আমার অভিনয় সে ধরে ফেলেছে।
হয়তো এটাই স্বাভাবিক। আমাদের সবারই বিভিন্ন সামাজিক মুখোশ থাকে। অতিথিদের সামনে একরকম, পরিবারের সামনে আরেকরকম, বন্ধুদের সামনে আরেকরকম।
কিন্তু কখনো কখনো মনে হয়, এই মুখোশগুলো খুলে ফেলতে পারলে কত স্বস্তি হত। সবার সামনে একই রকম থাকতে পারলে। কিন্তু সমাজ হয়তো সেটা মেনে নেবে না।
পরের বার অতিথি এলে আবার সেই একই অভিনয় করব। কারণ এটাই নিয়ম। এটাই প্রত্যাশা। এবং এই প্রত্যাশা পূরণ করাটাও আমার একটা দায়িত্ব।
একটু ভাবনা রেখে যান