ব্লগ

আমাদের ভালোবাসা কার?

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

হ্যাপি যখন আমার কাঁধে হাত রেখে দাঁড়াল, তখন তার হাতের উষ্ণতা আমার শার্টের ভিতর দিয়ে চামড়ায় পৌঁছে গেল। আরাশ তার বইয়ের পাতা থেকে চোখ তুলল। আমি হ্যাপির হাতটা আস্তে করে সরিয়ে দিলাম।

কেন?

আমার দাদার আমলে স্বামী-স্ত্রী একে অপরের দিকে তাকাতও না সন্তানের সামনে। আমার বাবার আমলে কথা বলতেন কিন্তু স্পর্শ ছিল নিষিদ্ধ। আমার আমলে এসে আমি আবিষ্কার করলাম, আমিও একই নীরব নিয়মের বন্দি।

কিন্তু এই নিয়ম কে তৈরি করেছে? কোন গ্রন্থে লেখা আছে যে পিতা-মাতার ভালোবাসা সন্তানের কাছে অদৃশ্য থাকবে? নাকি আমরা ধীরে ধীরে শিখেছি যে আবেগ মানেই লজ্জার বিষয়?

হ্যাপির হাসিতে যে আলো জ্বলে ওঠে, সেই আলো কি আরাশের জন্য ক্ষতিকর? তার চোখে ভালোবাসার যে নরম ছায়া, সেটা কি আরাশের মনে বিপজ্জনক কিছুর বীজ বুনে দেবে? নাকি উল্টো—আমার এই লুকানো খেলাই তাকে শেখাচ্ছে যে ভালোবাসা কোনো গোপন, লজ্জাজনক ব্যাপার?

গত রাতে আরাশ প্রশ্ন করেছিল, “বাবা, তুমি কি মাকে ভালোবাসো?”

আমি ‘হ্যাঁ’ বলেছিলাম। কিন্তু সেই ‘হ্যাঁ’র মধ্যে কোনো উষ্ণতা ছিল না। যেন একটা পরীক্ষার উত্তর দিয়েছি। আরাশ আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি। কিন্তু তার চোখে একটা প্রশ্ন রয়ে গেল।

আমার মনে পড়ে গেল আমার শৈশব। আমিও একবার আমার বাবাকে প্রশ্ন করেছিলাম, “বাবা, তুমি কি আম্মুকে ভালোবাসো?” বাবা আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়েছিলেন যেন আমি কোনো অশ্লীল কথা বলেছি। তিনি উত্তর দেননি। আমি বুঝে গিয়েছিলাম যে এই প্রশ্ন করা উচিত হয়নি।

হয়তো আরাশও তাই বুঝেছে।

এখন বুঝতে পারি, আমার বাবাও হয়তো এই একই কারাগারে বন্দি ছিলেন। তাঁর বাবাও। এভাবে শত শত বছর ধরে আমরা নিজেদের ভালোবাসাকে শিকলে বেঁধে রেখেছি, নাম দিয়েছি শিষ্টাচার।

কিন্তু এই শিকল কি সত্যিই আমাদের রক্ষা করেছে? নাকি আমরা আস্তে আস্তে ভুলে গেছি ভালোবাসা দেখানোর ভাষা?

আমি যখন ছোট ছিলাম, ভাবতাম বড়রা সবকিছু জানে। এখন বুঝি, আমার বাবাও জানতেন না কীভাবে মায়ের হাত ধরতে হয়, কীভাবে তাঁর প্রশংসা করতে হয়। তিনি হয়তো ভাবতেন এগুলো করলে আমার মনে খারাপ ভাব আসবে।

আর আমি? আমিও একই ভুল করে চলেছি।

হ্যাপি গতকাল রান্নাঘরে একা ছিল। আমি গিয়ে বলতে পারতাম, “তুমি আজ খুব সুন্দর লাগছ।” কিন্তু বলিনি। কারণ আরাশ হয়তো শুনবে। সে হয়তো ভাববে এইসব কথা বলা ঠিক নয়।

অথচ আরাশের তো জানা উচিত যে একজন পুরুষ কীভাবে তার স্ত্রীর যত্ন নেয়, কীভাবে তাকে ভালোবাসে। সে কীভাবে শিখবে ভালোবাসার ভাষা, যদি তার বাবা-মাকে সেই ভাষা বলতে না দেখে?

আমি বুঝতে পারি, এই চুপচাপ থাকাটাও এক ধরনের শিক্ষা। আরাশ শিখছে যে স্বামী-স্ত্রী মানে দুজন আনুষ্ঠানিক সহযোগী। সে শিখছে যে প্রেম করা যায়, কিন্তু দেখানো যায় না।

কিন্তু প্রেম কি শুধু অন্ধকারের জন্য? রাত হলেই কি শুধু আমরা মানুষ হয়ে উঠব?

আল্লাহ, আমি জানি না এই প্রশ্নের উত্তর। কিন্তু একটা কথা জানি। আমি চাই না আরাশ আমার মতো এই দ্বিধার মধ্যে বড় হোক। চাই না সে একদিন তার স্ত্রীর কাছ থেকে দূরে সরে যাক, ভয়ে যে তার সন্তান দেখে ফেলবে।

হয়তো ভালোবাসাই হচ্ছে সন্তানের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *