গতকাল সন্ধ্যায় আরাশ তার বন্ধুর বাড়িতে গেল। হ্যাপি তার বোনের সাথে ফোনে ব্যস্ত। আমি একা বসে ছিলাম, হঠাৎ একটা অদ্ভুত শূন্যতা অনুভব করলাম। মনে হল আমার কোনো দরকার নেই। কেউ আমাকে ডাকছে না, কেউ আমার কাছে কিছু চাইছে না। এই অপ্রয়োজনীয়তার অনুভূতি আমাকে এমন কষ্ট দিল যেটা আমি আগে কখনো স্বীকার করিনি।
আমি কি অন্যদের কাছে প্রয়োজনীয় হতে চাই, নাকি প্রয়োজনীয় হওয়ার মায়ায় আসক্ত?
জামিউর যখন তার সমস্যার কথা আমাকে বলে, আমি একটা গোপন সন্তুষ্টি পাই। “ভাই, তোমার পরামর্শ ছাড়া কিছু করি না।” তার এই কথায় আমার অহংকার বাড়ে। কিন্তু এই সন্তুষ্টি কি স্বাস্থ্যকর? নাকি আমি জামিউরের দুর্বলতায় আমার গুরুত্ব খুঁজে পাচ্ছি?
অফিসে যখন কেউ আমার কাছে সাহায্য চায়, আমি খুশি হই। “আপনি না থাকলে কাজটা হতো না।” এই কথা শুনে আমার মনে হয় আমার অস্তিত্বের একটা অর্থ আছে। কিন্তু এই খুশি কি আমার নিজের যোগ্যতার জন্য, নাকি অন্যের নির্ভরশীলতার জন্য?
আরাশ ছোটবেলায় রাতে ভয় পেলে আমার কাছে আসত। “বাবা, তুমি পাশে থাক।” সেই মুহূর্তে আমি অনুভব করতাম আমি কত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এখন সে নিজেই ঘুমায়। আমার সেই প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেছে। এটা কি তার বেড়ে ওঠা, নাকি আমার গুরুত্ব কমে যাওয়া?
হ্যাপি যখন সব কাজ নিজেই করে ফেলে, আমার একটু খারাপ লাগে। আমাকে কিছু বলে না, আমার মতামত নেয় না। আমি ভাবি, “আমার তো কোনো দরকারই নেই।” কিন্তু এই ভাবনা কি ন্যায্য? নাকি আমি চাই হ্যাপি আমার উপর নির্ভরশীল থাকুক?
সাইফুল কবির একদিন বলেছিল, “ভাই, তুমি না থাকলে আমার কী হতো!” আমি তার কথায় গর্বিত হয়েছিলাম। কিন্তু পরে ভেবেছি – আমি কি চাই সাইফুল আমার উপর নির্ভরশীল থাকুক? নাকি আমি চাই সে স্বাবলম্বী হোক?
মৃদুল কানাডায় গিয়ে যখন আর আমার পরামর্শ চায় না, আমার একটু হতাশা লাগে। আগে সে সব বিষয়ে আমার মতামত নিত। এখন সে নিজেই সিদ্ধান্ত নেয়। এটা কি তার উন্নতি, নাকি আমাদের দূরত্ব?
আমার মনে হয়, অন্যের কাছে প্রয়োজনীয় হওয়ার এই আকুতি একটা জটিল মানসিকতা। একদিকে এটা আমাদের অন্যের সেবা করতে অনুপ্রাণিত করে। অন্যদিকে এটা আমাদের অহংকারকে পুষ্ট করে।
বাবা মারা যাওয়ার পর যখন সবাই আমার দিকে তাকিয়েছিল, “এখন তুমিই সব সামলাবে,” আমি গর্বিত হয়েছিলাম। মনে হয়েছিল আমি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই গুরুত্ব কি পরিবারের প্রয়োজন থেকে, নাকি আমার প্রয়োজনীয় হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে?
আমি লক্ষ করেছি, যখন কেউ আমার সাহায্য ছাড়াই কোনো কাজ করে ফেলে, আমি একটু মন খারাপ করি। যেন আমার গুরুত্ব কমে গেছে। কিন্তু এই মন খারাপ করা কি যুক্তিযুক্ত? নাকি আমি চাই অন্যরা দুর্বল থাকুক যাতে আমার প্রয়োজন বেশি থাকে?
হ্যাপির মা যখন অসুস্থ ছিলেন, আমি তার সেবা করেছিলাম। সেই সময় আমি অনুভব করেছিলাম আমি কত প্রয়োজনীয়। কিন্তু এই অনুভূতি কি তার কষ্টের উপর ভিত্তি করে? আমি কি গোপনে চেয়েছিলাম তিনি আমার উপর নির্ভরশীল থাকুন?
আমার এই প্রয়োজনীয় হওয়ার আকুতি হয়তো আমার অনিরাপত্তা থেকে আসে। আমি যদি কারো কাজে না লাগি, তাহলে আমার অস্তিত্বের অর্থ কী? আমি যদি কারো প্রয়োজন না হই, তাহলে আমি কে?
কিন্তু এই প্রশ্নটাই কি ভুল? আমার অস্তিত্বের অর্থ কি অন্যের প্রয়োজনের উপর নির্ভর করে? নাকি আমার নিজের মূল্য আছে, অন্যের প্রয়োজন না থাকলেও?
আরাশকে যখন দেখি সে এখন অনেক কাজ নিজেই করতে পারে, আমার গর্বিত হওয়া উচিত। কিন্তু আমি একটু দুঃখও পাই। তার আর আমার এত প্রয়োজন নেই। এই দ্বিধা কি স্বাভাবিক?
হয়তো প্রকৃত ভালোবাসা হলো অন্যকে স্বাবলম্বী করে তোলা। তাদের এমনভাবে সাহায্য করা যাতে তারা আর আমার সাহায্যের প্রয়োজন না হয়। কিন্তু এই কাজ করতে গিয়ে আমি নিজের প্রয়োজনীয়তার অনুভূতি হারিয়ে ফেলি।
জামিউরকে যখন আমি পরামর্শ দিই, আমার উচিত তাকে এমনভাবে গাইড করা যাতে সে নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু তাহলে তো সে আর আমার পরামর্শ চাইবে না। আমার গুরুত্ব কমে যাবে।
এই লেখাটা লিখতে লিখতে আমার মনে হচ্ছে, আমার প্রয়োজনীয় হওয়ার আকুতি হয়তো একটা স্বার্থপর আকুতি। আমি অন্যের মঙ্গলের জন্য নয়, আমার অহংকারের জন্য প্রয়োজনীয় হতে চাই।
হয়তো আমার শেখা উচিত নিঃশর্ত সেবা করতে। কৃতজ্ঞতা বা স্বীকৃতির আশা না করে। অন্যের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে খুশি হতে, দুঃখ না পেতে।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ – বুঝতে হবে যে আমার মূল্য আমার নিজের মধ্যে। অন্যের প্রয়োজনে নয়। আমি যদি কারো কাজে না লাগি, তবুও আমার অস্তিত্বের অর্থ আছে।
হয়তো প্রকৃত পরিপক্কতা হলো প্রয়োজনীয় হওয়ার আকুতি ছেড়ে দিয়ে, শুধু ভালোবাসার কারণে সেবা করা।
একটু ভাবনা রেখে যান