ব্লগ

যেদিন টাকা পয়সা হল ভালোবাসার শত্রু

নভেম্বর ২০২৫ · 3 মিনিটে পড়া
শেয়ার

“আরাশের জুতা কিনতে হবে।” হ্যাপি বলল।

আমি মাথা নাড়লাম। “মাসের শেষে।”

“কিন্তু এই জুতা তো ছিঁড়ে গেছে।”

“আরো একমাস চলবে।”

হ্যাপি চুপ হয়ে গেল। আমিও চুপ।

এই নিরবতার মধ্যে একটা দেয়াল তৈরি হল। টাকার দেয়াল।

আমি জানি হ্যাপি কষ্ট পেয়েছে। সে চায় আরাশের জন্য সুন্দর জুতা কিনতে। একজন মায়ের এটাই তো স্বাভাবিক ইচ্ছা। কিন্তু আমি জানি আমাদের হাতে টাকা নেই।

আমি কি ভুল বলেছি? নাকি হ্যাপি বাস্তবতা বোঝে না?

এই প্রশ্নটা আমার মাথায় সারাদিন ঘুরল।

সন্ধ্যায় হ্যাপি আর আমার সাথে স্বাভাবিক কথা বলেনি। আরাশের সাথে কথা বলেছে, আমার সাথে শুধু প্রয়োজনীয় কথা।

“ভাত নেবে?”

“হ্যাঁ।”

“আর কিছু?”

“না।”

আমি বুঝতে পারি এই ঠাণ্ডা ব্যবহারের কারণ। টাকার অভাবে আমি আরাশের প্রয়োজন মেটাতে পারছি না। একজন বাবা হিসেবে আমি ব্যর্থ। একজন স্বামী হিসেবেও।

কিন্তু আমি কী করব? আমার যা আয়, তাতে মাসের শেষে টান পড়েই যায়। আমি তো আকাশ থেকে টাকা আনতে পারি না।

রাতে আমি হ্যাপিকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম।

“দেখ, আগামী মাসে আমার একটা লেখার টাকা আসবে। তখন আরাশের জন্য ভালো জুতা কিনে দেব।”

হ্যাপি বলল, “আগামী মাস মানে আরো ত্রিশ দিন। ততদিনে তার পা ফুলে যাবে।”

আমার গলা শুকিয়ে গেল। হ্যাপি ঠিক বলেছে। আরাশের জুতা সত্যিই ছোট হয়ে গেছে।

“তাহলে কী করি? চুরি করি?”

আমার এই কথায় হ্যাপি আরো রেগে গেল।

“চুরি করতে বলিনি। বলেছি একটা ছেলের মৌলিক প্রয়োজন।”

আমি চুপ হয়ে গেলাম। আমার মনে হল আমি একটা দানব। যে দানব তার নিজের সন্তানের প্রয়োজন মেটাতে পারে না।

পরদিন সকালে আমি আমার পুরনো একটা বই বিক্রি করলাম। সেই টাকায় আরাশের জুতা কিনলাম।

হ্যাপি খুশি হল। আরাশও। কিন্তু আমার মনে একটা তিক্ততা রয়ে গেল।

আমি ভাবলাম, ভালোবাসা কি এত সহজে পরাজিত হয়? একটা জুতার দামে কি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এত দূরত্ব তৈরি হয়?

আমার বন্ধু সাইফুল একবার বলেছিল, “বিয়ে মানে দুজন মানুষের টাকা-পয়সার হিসাব। ভালোবাসা পরে আসে।”

তখন আমি তার কথায় রাগ হয়েছিলাম। কিন্তু এখন মনে হয় সে হয়তো ঠিকই বলেছিল।

কিন্তু আমি মানতে পারি না। আমি চাই আমাদের ভালোবাসা টাকার চেয়ে বড় হোক।

আল্লাহ, কেন এমন হয়? কেন টাকার অভাবে ভালোবাসার মানুষদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়? কেন একটা জুতার দামেই পরিবারে ঝড় ওঠে?

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *