দুপুর দেড়টায় অফিসের টেবিলে বসে আছি। কলিগরা খাওয়া সেরে চা খাচ্ছে, আর আমি মোবাইলে আরাশের স্কুলের হেডস্যারের মিস কল দেখছি। চতুর্থবার। হৃদপিণ্ড দুম দাম করে উঠল। আবার কি? গলা শুকিয়ে গেল। ফোনটা রিং করার আগেই ভাবছি—এইবার কি অসুখ, না দুষ্টুমি, না কোনো সমস্যা?
“স্যার, আরাশ ক্লাসে কান্নাকাটি করছে। বাড়িতে কিছু হয়েছে নাকি?”
কিছু হয়েছে? হ্যাঁ, অনেক কিছুই হয়েছে। গতকাল সকালে হ্যাপি বলেছিল বাজারের টাকা নেই। আমি বলেছিলাম, “কাল পেমেন্ট আসবে।” কিন্তু পেমেন্ট এখনো আসেনি। আর আরাশ? সে হয়তো শুনেছে রাতে আমাদের কথা। হয়তো বুঝেছে বাবার আবার চাকরি যাওয়ার ভয়।
অফিস থেকে ছুটি নিয়ে স্কুলে গেলাম। আরাশ আমাকে দেখে জড়িয়ে ধরল। বাড়ির পথে জিজ্ঞেস করল, “বাবা, আপনি কি আর চাকরি করবেন না?”
এই প্রশ্নটা আমার পেটে ছুরি বসিয়ে দিল। আরাশের চোখে যে আতঙ্ক, সেটা আমার চোখেরই প্রতিবিম্ব। একটা এগারো বছরের বাচ্চা কেন চাকরি নিয়ে চিন্তা করবে? কেন সে জানবে যে বাবার কাজের অনিশ্চয়তা মানে বাড়ির অনিশ্চয়তা?
“আমি কি ভুল কিছু করছি?” এই প্রশ্নটা আমাকে ভিতর থেকে খেয়ে ফেলে। সবাই বলে—ওয়ার্ক লাইফ ব্যালেন্স। কাজ আর জীবনের মাঝে ভারসাম্য। কিন্তু যখন কাজ নেই, তখন জীবন নেই। যখন কাজ আছে, তখন জীবন নেই। ভারসাম্য কোথায়?
হ্যাপি সন্ধ্যেবেলা বলল, “তুমি বেশি চিন্তা করো। দেখো, আল্লাহ সব ঠিক করবেন।” কিন্তু আল্লাহ কি চান যে আমি চিন্তা না করি? না কি চান যে আমি আরো বেশি চেষ্টা করি? কোনটা ঈমান, কোনটা অলসতা?
রাতে আরাশ ঘুমিয়ে গেলে, হ্যাপি আর আমি বারান্দায় বসলাম। চাঁদ ছিল, কিন্তু আমার মন অন্ধকার। হ্যাপি বলল, “আমি জানি তুমি কষ্ট পাচ্ছো। কিন্তু আরাশের জন্য হলেও হাসো।”
হাসি। আরেকটা মুখোশ। সারাদিন অফিসে মুখোশ পরি—সব ঠিক আছে বলার জন্য। বাড়িতে এসে মুখোশ পরি—কোনো চিন্তা নেই বলার জন্য। রাতে একা হলেই মুখোশ খুলে ফেলি, আর তখন আসল মুখটা দেখি। ভয়ে ভরা, ক্লান্তিতে ভাঙা।
কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে—এই যে দৌড়াচ্ছি, কোথায় যাচ্ছি? সফল মানুষরা বলে, “পেশন ফলো করো।” আমার পেশন কী? বাঁচার জন্য কাজ করা, নাকি কাজের জন্য বাঁচা? নাকি দুটোই ভুল?
মাঝে মাঝে ভাবি, সবচেয়ে সুখী মানুষ কে? যার কাছে আল্লাহ আছে। কিন্তু আল্লাহর কাছে যেতে হলে কি দুনিয়াকে ছাড়তে হবে? নাকি দুনিয়ার মাঝেই আল্লাহকে পেতে হবে? আরাশের দিকে তাকিয়ে ভাবি—এই শিশুর জন্য কি আমাকে ভুল পথে যেতে হবে? নাকি সঠিক পথে থাকার জন্য তাকে কষ্ট দিতে হবে?
ভারসাম্য। এই শব্দটাই হয়তো মিথ্যা। হয়তো জীবনে কোনো ভারসাম্য নেই, শুধু আছে পছন্দ। প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে। আজকে আরাশের হাসির জন্য মিথ্যা বলব, না সত্যের জন্য তাকে কষ্ট দেব?
বারান্দায় বসে চাঁদের দিকে তাকিয়ে ভাবছি—এই চাঁদ কি কখনো ভারসাম্য খোঁজে? নাকি শুধু তার কক্ষপথে চলে, নিজের আলো দিয়ে অন্ধকার ভেদ করার চেষ্টা করে?
হয়তো সেটাই উত্তর। ভারসাম্য না, বরং আলো। যতটুকু পারি, যেখানে পারি, আলো দেওয়ার চেষ্টা করা। হ্যাপির মুখে হাসি আনার চেষ্টা। আরাশের চোখ থেকে ভয় সরানোর চেষ্টা। আর নিজের ভিতরে অন্ধকারের সাথে লড়াই করার চেষ্টা।
কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—এই লড়াই কি আমার একার, নাকি সবার? আর যদি সবার হয়, তাহলে আমরা কেন একা একা লড়ছি?
একটু ভাবনা রেখে যান