সকালটা শুরু হয়েছিল এক সাধারণ প্রশ্ন দিয়ে। হ্যাপি রান্নাঘর থেকে জিজ্ঞেস করল, “আজ কী করব? ভাত নাকি রুটি?” এমন নির্দোষ একটা প্রশ্ন, যে কোনো স্বাভাবিক মানুষ দুই সেকেন্ডেই উত্তর দিয়ে দেবে। কিন্তু আমার কাছে এই প্রশ্নটা পৌঁছানোর সাথে সাথেই মনের ভিতর একটা জটিল যন্ত্র চালু হয়ে গেল।
ভাত মানে কী? আমাদের শেকড়, আমাদের বাঙালিয়ানা। মায়ের হাতের রান্না, দুপুরে গরম ভাতে ঘি আর লবণ দিয়ে খাওয়ার সেই স্বাদ। কিন্তু আবার ভাত মানে কার্বোহাইড্রেট, ওজন বৃদ্ধি, আরাশের জন্য হয়তো ভালো না। রুটি তো স্বাস্থ্যকর। গমের আটা, ফাইবার। কিন্তু রুটি মানে তো অন্য কোনো সংস্কৃতি, অন্য কোনো ঘরানার খাবার।
আমি দাঁড়িয়ে আছি বারান্দায়, আরাশের মতো রাস্তার মানুষগুলোকে দেখছি। কেউ হয়তো তাড়াতাড়ি অফিসে যাচ্ছে, কেউ বা সবজি কিনতে। তাদের কারো মুখেই এমন দ্বিধার ছাপ নেই। তারা নিশ্চয়ই সকালে উঠেই জেনে গেছে আজ কী খাবে। আমি কেন পারি না?
হ্যাপি আবার ডাকল। “কী হল? বলছ না কিছু।” আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, “যেটা ভালো লাগে সেটাই কর।” কিন্তু মন বলল, এটা কোনো উত্তর হল? আমি কি এতটাই দায়িত্বহীন যে নিজের পরিবারের খাবারের ব্যাপারেও একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারি না?
দিনভর এই প্রশ্নটা আমাকে তাড়া করে ফিরেছে। অফিসে বসে বসে ভাবছি, এমন ছোট একটা বিষয়েও আমার এত সময় লাগে কেন? বাবা থাকলে তো একদম ঝটপট বলে দিতেন। কিন্তু এখন? আমি যেন হারিয়ে গেছি নিজেরই সিদ্ধান্তের জগতে।
সন্ধ্যায় ফিরে দেখি হ্যাপি ভাতই রেঁধেছে। মনে হল, কেমন যেন স্বস্তি। আবার মনে হল, আমি কি ভাতকেই বেশি ভালোবাসি বলে স্বস্তি পাচ্ছি? নাকি সিদ্ধান্তের দায় এড়ানোর জন্য?
আরাশ খেতে বসে বলল, “আব্বু, আজ আপনার মুখ দেখে মনে হচ্ছে আপনি কোনো বড় সমস্যা নিয়ে ভাবছেন।” এগারো বছরের একটা ছেলে আমার মনের অবস্থা পড়তে পারে, আর আমি পারি না নিজের খাবারের পছন্দ বুঝতে।
রাতে শুয়ে ভাবলাম, এটা কি শুধু ভাত-রুটির প্রশ্ন? নাকি আরো গভীরে কিছু? আমি কি আসলে ভয় পাই যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে? যদি ভুল হয়ে যায়? যদি পরিবারের মনোমতো না হয়? যদি…?
আল্লাহর কাছে মনে মনে বলি, এমন ছোট একটা বিষয়েও আমার এত দ্বিধা কেন? আমি কি এতটাই দুর্বল? নাকি এটাই স্বাভাবিক, যে মানুষ খুব ভেবেচিন্তে জীবনযাপন করতে চায়?
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়। আগামীকাল আবার যদি হ্যাপি জিজ্ঞেস করে, “ভাত নাকি রুটি?” আমি কী বলব? এই দ্বিধা কি চিরকাল আমার সাথেই থাকবে? নাকি একদিন আমিও অন্যদের মতো নিমিষেই উত্তর দিতে পারব?
হয়তো এটাই আমার চরিত্র। হয়তো এই দ্বিধাগ্রস্ততাই আমাকে আলাদা করে। কিন্তু কখনো কখনো মনে হয়, এটা আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ – সেটাও ঠিক বুঝি না।
একটু ভাবনা রেখে যান