আজ বিকালে অফিসের বার্ষিক অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। পুরো হলভর্তি মানুষ। সবাই কথা বলছে, হাসছে, আনন্দ করছে। আমিও মিশেছি। কলিগদের সাথে গল্প করেছি। সাহেবের সাথে কুশল বিনিময় করেছি। রিফ্রেশমেন্টে অংশ নিয়েছি।
কিন্তু অনুষ্ঠান শেষে বাসায় ফেরার পথে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হলো। মনে হলো আমি পুরো সময় একা ছিলাম।
এত মানুষের মাঝে থেকেও কীভাবে একা থাকা যায়?
সবার সাথে কথা বলেছি, কিন্তু কোনো কথাই বলতে পারিনি। “কেমন আছেন?” – “ভালো।” “কাজ কেমন চলছে?” – “চলছে।” “পরিবার কেমন?” – “সবাই ভালো।”
এই কথাগুলো কি আমার? নাকি এগুলো রেডিমেড বাক্য যেগুলো সামাজিক পরিস্থিতিতে ব্যবহার করা হয়?
হলের এক কোণে দাঁড়িয়ে যখন দেখছিলাম সবাই কত স্বাভাবিকভাবে একে অপরের সাথে মিশছে, তখন মনে হয়েছিল আমি একটা কাঁচের দেয়ালের পেছনে আছি। সব দেখতে পাচ্ছি, সব শুনতে পাচ্ছি, কিন্তু স্পর্শ করতে পারছি না।
রহিম ভাই বলছিলেন তার ছেলের বিয়ের গল্প। সবাই হাসছিল। আমিও হাসলাম। কিন্তু সেই হাসিটা কি আমার ছিল? নাকি এটা একটা মুখোশ যেটা আমি পরে রাখি যাতে অন্যরা বুঝতে না পারে আমি কত একা?
ছোটবেলায় পাড়ার সবার সাথে খেলতাম। কিন্তু খেলার মাঝেও মনে হতো আমি একা। অন্যরা যেভাবে উৎসাহী হতো, আমি সেভাবে পারতাম না। যেন তাদের সাথে আমার একটা স্বচ্ছ পর্দা আছে।
বয়স বাড়ার সাথে সাথে সেই পর্দা আরো পুরু হয়েছে। এখন যখন হ্যাপির সাথে বসি, তখনো মনে হয় আমি একা। যখন আরাশের সাথে খেলি, তখনো একই অনুভূতি।
আমি কি এমন একটা ভাষায় কথা বলি যেটা অন্যরা বুঝতে পারে না? নাকি অন্যরা এমন একটা ভাষায় কথা বলে যেটা আমি বুঝি না?
অনুষ্ঠানে করিম সাহেব তার সাফল্যের গল্প বলছিলেন। আমি শুনছিলাম, কিন্তু মনে হচ্ছিল তিনি অন্য কোনো গ্রহের ভাষায় কথা বলছেন। তার আনন্দ, তার গর্ব, তার উৎসাহ – এসব আমার কাছে বিদেশি লাগছিল।
হয়তো আমার ভেতরে এমন কোনো অংশ নেই যেটা অন্যদের সাথে যুক্ত হতে পারে। যেন আমি একটা রেডিও যার এন্টেনা ভেঙে গেছে। সব স্টেশন আছে, কিন্তু কোনো সিগন্যাল ধরতে পারি না।
বাসে ফেরার পথে পাশের সিটে একজন তার ফোনে কথা বলছিল। “হ্যাঁ বন্ধু, খুব মজা হয়েছে আজ। কত দিন পর সবার সাথে দেখা!”
আমার মনে হলো, আমি কি কখনো এভাবে বলতে পারব? কোনো অনুষ্ঠানের পর কি আমার মজা লাগার মতো কিছু থাকে?
নাকি আমি এমন একটা মানুষ যে ভিড়ের মাঝেও একা, আনন্দের মাঝেও বিষণ্ণ, উৎসবের মাঝেও নিস্তব্ধ?
বাড়ি ফিরে হ্যাপি জিজ্ঞেস করল, “কেমন লাগল অনুষ্ঠান?”
আমি বললাম, “ভালো লেগেছে।”
কিন্তু ভেতরে চিৎকার করে বলতে চাইলাম, “আমি জানি না ভালো লাগা কাকে বলে।”
আরাশ বলল, “বাবা, তুমি সবার সাথে কথা বলেছ?”
বললাম, “হ্যাঁ।”
কিন্তু বলতে চাইলাম, “কথা বলেছি, কিন্তু যোগাযোগ হয়নি।”
রাতে বিছানায় শুয়ে ভাবি, এই একাকীত্ব কি আমার পছন্দ? নাকি এটা আমার উপর চাপিয়ে দেওয়া একটা সাজা?
আল্লাহ, আমাকে কি এমনভাবে বানিয়েছেন যে আমি কখনো সত্যিকারের সঙ্গ পাবো না? নাকি সত্যিকারের সঙ্গ মানে অন্য কিছু?
হয়তো একা থাকাটাই আমার সবচেয়ে সৎ অবস্থা।
একটু ভাবনা রেখে যান