শপিং মলে দাঁড়িয়ে আছি। চারপাশে হাজার মানুষ। কেউ কেনাকাটা করছে, কেউ খাচ্ছে, কেউ ফোনে কথা বলছে। সবার মুখে একটা ব্যস্ততার ভাব। সবাই কোথাও যাচ্ছে।
কিন্তু আমি দাঁড়িয়ে আছি। কেবল দাঁড়িয়ে আছি।
মানুষগুলো আমার পাশ দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মনে হচ্ছে – তারা আমাকে দেখতে পাচ্ছে না। যেন আমি একটা ভূত। বা যেন আমি একটা স্বচ্ছ গ্লাসের মতো। সবাই আমার ভেতর দিয়ে তাকিয়ে দেখছে।
একটা পরিবার যাচ্ছে। বাবা, মা, দুটো বাচ্চা। তারা হাসছে, কথা বলছে। তাদের মধ্যে একটা যোগাযোগ আছে। একে অপরের সাথে সংযুক্ত।
আমি তাদের দেখি আর ভাবি – এই সংযোগটা কী? এই যে তারা একসাথে আছে, এটা কীভাবে সম্ভব? আমার তো মনে হয় আমি একটা দ্বীপ। একটা নিঃসঙ্গ দ্বীপ।
একটা দোকানে যাই। বিক্রেতা বলে, “কী লাগবে?” আমি বলি, “কিছু না, দেখছি।” কিন্তু সত্যি কথা হলো, আমি খুঁজছি। খুঁজছি একটা সংযোগ। একটা যোগাযোগ।
বিক্রেতা আমার দিকে তাকায়। কিন্তু তার দৃষ্টি আমার ওপর দিয়ে পার হয়ে যায়। সে আমাকে দেখে, কিন্তু আমাকে দেখে না। সে দেখে একটা গ্রাহক। একটা সম্ভাব্য বিক্রি।
আমি তার চোখের দিকে তাকাই। চেষ্টা করি একটা মানুষের সাথে চোখাচোখি করতে। কিন্তু সে চোখ সরিয়ে নেয়। হয়তো অস্বস্তি লাগছে তার।
ফুড কোর্টে যাই। একটা টেবিলে বসি। চারপাশে অনেক মানুষ। কিন্তু প্রত্যেকে তার নিজের জগতে। একে অন্যের থেকে আলাদা।
আমার পাশের টেবিলে একটা ছেলে একা বসে আছে। সেও আমার মতো একা। আমি তার দিকে তাকাই। সেও আমার দিকে তাকায়। একটা সেকেন্ডের জন্য আমাদের চোখাচোখি হয়।
আমি ভাবি – এই ছেলেটাও কি আমার মতো অনুভব করছে? সেও কি ভাবছে যে সে একটা ভূত?
কিন্তু পরক্ষণেই সে তার ফোনে তাকিয়ে যায়। সেই যোগাযোগটা ভেঙে যায়।
আমি উঠে হাঁটতে শুরু করি। একতলা থেকে দোতলায় যাই। দোতলা থেকে তিনতলায়। মানুষ সব জায়গাতেই। কিন্তু কেউ আমার সাথে নেই।
এস্কেলেটরে উঠি। আমার সামনে পেছনে অনেক মানুষ। কিন্তু আমি মনে করতে পারি না – আমি কেন এস্কেলেটরে উঠলাম। আমার গন্তব্য কী।
হঠাৎ মনে হয় – আমি হয়তো ভুল জায়গায় আছি। এই মলটা আমার জন্য তৈরি নয়। এখানে যারা আছে, তারা জানে কীভাবে মানুষের সাথে থাকতে হয়। আর আমি জানি না।
আমি বাইরে বের হয়ে আসি। রাস্তায় আরো বেশি মানুষ। গাড়ি, বাস, রিকশা। সবাই কোথাও যাচ্ছে।
একটা বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়াই। লোকজন বাসের জন্য অপেক্ষা করছে। আমিও অপেক্ষা করি। কিন্তু আমি জানি না কোন বাসের জন্য।
একটা বাস এলো। সবাই উঠে গেল। আমি উঠলাম না। আরেকটা বাস এলো। আবার সবাই উঠে গেল। আমি আবার উঠলাম না।
তৃতীয় বাসে আমিও উঠলাম। ভেতরে গিয়ে দেখি – সবাই তার নিজের কাজে ব্যস্ত। কেউ জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছে, কেউ ফোন দেখছে, কেউ ঘুমাচ্ছে।
আমি একটা সিটে বসি। আমার পাশে একজন বসে। কিন্তু আমরা কথা বলি না। এমনভাবে বসে থাকি যেন আমরা একে অপরকে দেখতে পাচ্ছি না।
বাস চলতে থাকে। আমি জানি না কোথায় নামব। হয়তো শেষ স্টপেজে নামব। হয়তো পরের স্টপেজে।
হয়তো আমি কখনোই নামব না। হয়তো এই বাসেই থেকে যাব। এই অচেনা মানুষদের সাথে।
অন্তত এখানে আমি একা নই। এখানে আমি ভিড়ের মধ্যে একা।
আর ভিড়ের মধ্যে একা থাকাটা হয়তো সম্পূর্ণ একা থাকার চেয়ে কম কষ্টকর।
অন্তত এই ভান করতে পারি যে আমি সবার সাথে আছি।
একটু ভাবনা রেখে যান