জীবন

অপেক্ষা

অক্টোবর ২০২৫ · 11 মিনিটে পড়া
শেয়ার

গতকাল রাতে শুয়ে ভাবছিলাম। নতুন চাকরি পেলে কী করব।

ফ্ল্যাট ভাড়া নেব। নতুন জায়গায়। বড় ব্যালকনি থাকবে। সকালে চা খাব সেখানে।

কাপড় কিনব। ভালো কাপড়। যেগুলো এখন কিনতে পারি না।

বন্ধুদের পার্টি দেব। বলব, দেখো, পেরেছি।

এসব ভাবতে ভাবতে টের পাইনি মা ডাকছে।

“খাবার খাবে?”

শুনিনি।

“শোনো, খেয়ে নাও।”

শুনিনি।

“তৃতীয়বার ডাকছি।”

তখন শুনলাম।

উঠে গেলাম। খেলাম।

মা বলল, “কী ভাবছিলে?”

“কিছু না।”

“মিথ্যা বলো না। এত মগ্ন ছিলে।”

বললাম, “চাকরির কথা ভাবছিলাম।”

মা চুপ করে রইল। তারপর বলল, “এখনো তো পাওনি।”

“জানি। কিন্তু পেলে কী করব ভাবছিলাম।”

মা আর কিছু বলল না।

কিন্তু চোখ বলছিল, আবার।

আবার একই জিনিস।

আবার ভবিষ্যত।

স্কুলে পড়ার সময় ভাবতাম, কলেজে গেলে মুক্তি পাব।

স্কুল শেষ হলো। কলেজে গেলাম।

মুক্তি পেলাম?

না।

কলেজে পড়ার সময় ভাবতাম, চাকরি পেলে সব ঠিক হবে।

কলেজ শেষ হলো। চাকরি পেলাম। ছেড়ে দিলাম।

সব ঠিক হলো?

না।

এখন আবার চাকরি খুঁজছি। ভাবছি, এবার পেলে জীবন শুরু হবে।

কিন্তু জীবন কবে শুরু হয়?

জানি না।

আরাশকে একবার বলেছিলাম, “তুই বড় হলে কী হতে চাস?”

আরাশ বলল, “জানি না। এখন কী?”

“এখন তো ছোট।”

“ছোট থাকলে কি কিছু হওয়া যায় না?”

থেমে গেলাম। হওয়া যায় না?

আরাশ বলল, “তুমি বড়। তুমি কী হয়েছো?”

“আমি?”

“হ্যাঁ। তুমি কী হয়েছো এখন?”

বলতে পারলাম না।

আরাশ বলল, “তুমি তো সবসময় বলো পরে হবে। কিন্তু পরে কখন?”

“পরে মানে… ভবিষ্যতে।”

“ভবিষ্যৎ কখন আসবে?”

“আসবে। একদিন।”

আরাশ বলল, “কিন্তু যখন আসবে, তখন তো সেটা এখন হবে। তুমি তখনও বলবে পরে?”

আমি কিছু বললাম না।

আরাশ ঠিক বলেছে।

যখন ভবিষ্যৎ আসবে, সেটা আর ভবিষ্যৎ থাকবে না। হবে বর্তমান।

এবং তখন আবার অপেক্ষা করব।

আরেকটা ভবিষ্যতের।

হ্যাপি বলে, “তুমি কখনো এখানে থাকো না।”

“কোথায় থাকি?”

“পরে। কখনো স্কুলে। কখনো কলেজে। কখনো চাকরিতে। কিন্তু এখানে না।”

“এখানে মানে?”

“এখন। এই মুহূর্তে। আমার সাথে। আরাশের সাথে।”

বলতে চাই, আছি তো।

কিন্তু সত্যি আছি কি?

শরীর আছে। কিন্তু মন?

মন পড়ে আছে পরের মাসে। যখন ইন্টারভিউ হবে। যখন চাকরি হবে। যখন ফ্ল্যাট নেব।

হ্যাপি বলে, “তুমি জানো, যখন সেই পরে আসবে, তখনও তুমি এখানে থাকবে না।”

“কোথায় থাকব?”

“আরও পরে।”

সত্যি।

চাকরি পেলে ভাববো, প্রমোশন হলে ভালো হবে।

প্রমোশন হলে ভাববো, বাড়ি কিনলে ভালো হবে।

বাড়ি কিনলে ভাববো, অবসর নিলে ভালো হবে।

অবসর নিলে?

তখন হয়তো বুঝব, জীবন চলে গেছে। অপেক্ষা করতে করতে।

সাইফুল বলেছিল, “তুই কবে বিয়ে করবি?”

“জানি না। চাকরি হলে।”

“চাকরি তো ছিল। ছেড়ে দিলি।”

“হ্যাঁ। এখন আবার খুঁজছি।”

সাইফুল বলল, “তুই সবসময় অপেক্ষা করিস। কিসের জন্য?”

“ঠিক সময়ের জন্য।”

“ঠিক সময় কখন?”

“যখন সব ঠিক হবে।”

সাইফুল হাসল। “সব কখনো ঠিক হয় না।”

চুপ করে রইলাম।

সাইফুল বলল, “আমার বিয়ে হয়েছে। সব ঠিক? না। কিন্তু জীবন চলছে। তুই অপেক্ষা করছিস। জীবন চলছে? না।”

ঠিক বলেছে।

আমি অপেক্ষা করছি। জীবন দাঁড়িয়ে আছে।

না। জীবন দাঁড়িয়ে নেই। জীবন চলছে। আমি দাঁড়িয়ে আছি।

মা মারা গেলেন। তখন ভেবেছিলাম, যখন দুঃখ কমবে, তখন আবার শুরু করব।

দুঃখ কমল।

শুরু করলাম?

না।

ভাবলাম, চাকরি পেলে শুরু করব।

চাকরি পেলাম।

শুরু করলাম?

না।

ভাবলাম, ভালো চাকরি পেলে শুরু করব।

কখন শুরু করব?

জানি না।

হয়তো কখনোই না।

হয়তো সারাজীবন শুধু শুরু করার জন্য অপেক্ষা করব।

এবং শেষে দেখব, শুরু করার মতো সময় আর নেই।

বাবু একবার বলেছিল, “মনে আছে স্কুলে ভাবতাম বড় হলে যা ইচ্ছা করব?”

“হ্যাঁ।”

“এখন বড়। কী করছিস?”

ভাবলাম। কী করছি?

অপেক্ষা করছি।

বাবু বলল, “আমরা সবাই একই। অপেক্ষা করছি। কিসের জন্য জানি না। কিন্তু অপেক্ষা করছি।”

“হয়তো নিখুঁত সময়ের জন্য।”

বাবু হাসল। “নিখুঁত সময় বলে কিছু নেই। শুধু আছে এই সময়। এবং আমরা এই সময় নষ্ট করছি অপেক্ষা করে।”

রাতে শুয়ে ভাবলাম। আমি কী করছি?

চাকরির স্বপ্ন দেখছি। ফ্ল্যাটের স্বপ্ন দেখছি।

কিন্তু এখন?

এখন হ্যাপি পাশে শুয়ে আছে। আরাশ ঘুমাচ্ছে পাশের রুমে।

এটা কি যথেষ্ট না?

না। মনে হয় যথেষ্ট না। মনে হয় চাকরি হলে তখন যথেষ্ট হবে।

কিন্তু হবে?

চাকরি হলে তখন ভাববো, বাড়ি হলে যথেষ্ট হবে।

বাড়ি হলে ভাববো, গাড়ি হলে যথেষ্ট হবে।

কখনো যথেষ্ট হবে না।

কারণ যথেষ্ট কোনো জায়গায় নেই। যথেষ্ট আছে এখানে। অথবা কোথাও নেই।

আরাশ স্কুল থেকে এসে বলল, “আমি কবে বড় হব?”

“কেন? বড় হতে চাস?”

“হ্যাঁ। তাহলে যা ইচ্ছা করতে পারব।”

আমি বললাম, “বড় হলে কী করবি?”

আরাশ বলল, “জানি না। কিন্তু বড়রা তো যা ইচ্ছা করে।”

হাসলাম। “তুই মনে করিস আমরা যা ইচ্ছা করি?”

“করো না?”

“না। আমরাও অপেক্ষা করি।”

আরাশ বলল, “কিসের?”

“জানি না। হয়তো আরও বড় হওয়ার।”

আরাশ মাথা চুলকালো। “তাহলে কখন করবে যা ইচ্ছা?”

“জানি না।”

আরাশ বলল, “আমি এখনই করব।”

“কী করবি?”

“খেলব।”

গেল খেলতে।

আমি বসে রইলাম।

আরাশ ঠিক বলেছে। এখনই করা উচিত যা করার।

কিন্তু আমি কী করছি?

ভাবছি চাকরি হলে কী করব।

এখন কী করছি?

কিছু না। শুধু অপেক্ষা।

হ্যাপি জিজ্ঞেস করল, “তুমি সুখী?”

“কেন জিজ্ঞেস করছো?”

“উত্তর দাও।”

ভাবলাম। সুখী?

“জানি না। চাকরি হলে হয়তো হব।”

হ্যাপি বলল, “চাকরি ছিল। তখন সুখী ছিলে?”

ছিলাম?

মনে করার চেষ্টা করলাম। না। তখনও ভাবতাম, ভালো চাকরি পেলে সুখী হব।

হ্যাপি বলল, “তুমি কখনো সুখী হবে না।”

“কেন বলছো এমন?”

“কারণ তুমি মনে করো সুখ কোথাও দূরে আছে। ভবিষ্যতে। কিন্তু যখন ভবিষ্যৎ আসবে, তুমি আবার দূরে তাকাবে।”

চুপ করে রইলাম।

হ্যাপি ঠিক বলেছে।

সুখ আমি খুঁজছি ভবিষ্যতে। কিন্তু ভবিষ্যৎ কখনো আসে না। শুধু আসে বর্তমান। আর বর্তমানে আমি নেই।

হ্যাপি বলল, “তুমি জানো এই মুহূর্তে কী আছে?”

“কী?”

“আমি। আরাশ। ঘর। খাবার। নিঃশ্বাস।”

“জানি।”

“কিন্তু তুমি দেখছো না। তুমি দেখছো চাকরি। ফ্ল্যাট। গাড়ি। যেগুলো এখনো নেই। হয়তো কখনোই হবে না।”

আমি কিছু বললাম না।

কারণ হ্যাপি সত্যি বলছে।

আমি যা আছে দেখছি না। দেখছি যা নেই।

এবং যা নেই, সেটা পেতে যা আছে নষ্ট করছি।

রাতে আবার শুয়ে ভাবছিলাম। চাকরি হলে কী করব।

হঠাৎ থামলাম।

আবার? আবার একই?

উঠে বসলাম।

জানালা দিয়ে তাকালাম। অন্ধকার।

হ্যাপি ঘুমাচ্ছে। নিঃশ্বাস নিচ্ছে। ছন্দে।

আরাশ ঘুমাচ্ছে। মাঝে মাঝে নড়ছে।

এটা কি যথেষ্ট?

জানি না।

কিন্তু এটাই আছে। এখন।

চাকরি নেই। ফ্ল্যাট নেই।

কিন্তু হ্যাপি আছে। আরাশ আছে। ঘর আছে।

এটা যথেষ্ট কি না জানি না। কিন্তু এটা আছে।

এবং আমি এটা দেখছি না। দেখছি যা নেই।

শুয়ে পড়লাম।

চোখ বন্ধ করলাম।

আবার শুরু হলো। চাকরির স্বপ্ন। ফ্ল্যাটের স্বপ্ন।

চোখ খুললাম।

থামাতে হবে। কিন্তু কীভাবে?

জানি না।

হয়তো থামানো যায় না। হয়তো এটাই আমি।

অপেক্ষা করা। স্বপ্ন দেখা। বর্তমান এড়িয়ে যাওয়া।

হয়তো এভাবেই কাটবে জীবন।

অপেক্ষা করতে করতে।

এবং শেষে দেখব, কিছুই পাইনি।

কারণ যা চেয়েছিলাম, পেলেও তখন আর চাইনি। চেয়েছি অন্য কিছু।

এবং যা ছিল, সেটা দেখিনি। কারণ তাকিয়ে ছিলাম যা নেই।

মা ডাকছিল তিনবার। খাবার খেতে।

আমি শুনিনি। ভাবছিলাম ভবিষ্যতের কথা।

মা এখন নেই।

এখন মনে হয়, সেদিন শুনলে ভালো হতো।

মায়ের কণ্ঠ শুনতাম। মায়ের মুখ দেখতাম।

কিন্তু দেখিনি। কারণ ব্যস্ত ছিলাম স্বপ্ন দেখতে।

এখন মা নেই। স্বপ্ন আছে।

কিন্তু স্বপ্ন দিয়ে কী হবে?

স্বপ্ন শোনা যায় না। ছোঁয়া যায় না।

মা যেত। মা ছিল।

কিন্তু আমি দেখিনি।

এবং এখনও দেখছি না। হ্যাপি আছে। আরাশ আছে।

কিন্তু দেখছি না।

দেখছি চাকরি। ফ্ল্যাট। ভবিষ্যৎ।

এবং যখন ভবিষ্যৎ আসবে, হ্যাপিও চলে যাবে। আরাশও বড় হবে।

তখন মনে হবে, এখন থাকলে ভালো হতো।

কিন্তু এখন নেই। কারণ এখন তখনে তাকিয়ে আছি।

সাইফুল বলেছিল, “আমরা সবাই মারা যাচ্ছি। ধীরে ধীরে। প্রতিদিন একটু একটু করে।”

“কেন বলছিস এমন?”

“কারণ আমরা বাঁচছি না। শুধু অপেক্ষা করছি বাঁচার জন্য।”

“কখন বাঁচব?”

সাইফুল বলল, “কখনোই না। কারণ আমরা মনে করি বাঁচা মানে কিছু একটা পাওয়া। কিন্তু বাঁচা মানে এই মুহূর্তে থাকা। এবং আমরা কখনো এই মুহূর্তে নেই।”

ঠিক।

আমি কখনো এখানে নেই।

সবসময় সেখানে। যেখানে এখনো পৌঁছাইনি। হয়তো কখনোই পৌঁছাব না।

এবং পৌঁছালেও তখন আবার অন্য সেখানে তাকিয়ে থাকব।

এভাবেই কাটবে জীবন।

এখানে থেকে সেখানে তাকিয়ে।

এবং শেষে দেখব, কোথাও ছিলাম না।

শুধু ছিলাম পথে। অপেক্ষায়।

এবং পথে থাকতে থাকতে পথ শেষ হয়ে যাবে।

হ্যাপি ঘুমাচ্ছে।

আমি জেগে আছি।

ভাবছি ভবিষ্যতের কথা।

কিন্তু ভবিষ্যৎ কোথায়?

নেই। শুধু আছে এখন।

এই রাত। এই নিঃশ্বাস। এই নীরবতা।

এটাই আছে। এবং আমি এটা দেখছি না।

দেখছি যা নেই।

এবং এভাবেই হারিয়ে ফেলছি যা আছে।

চোখ বন্ধ করলাম।

ঘুমাতে চাইলাম।

কিন্তু ঘুম এল না।

মনে পড়তে লাগল।

চাকরি পেলে কী করব।

ফ্ল্যাট নেব।

কাপড় কিনব।

পার্টি দেব।

এবং তখন?

তখন সুখী হব?

জানি না।

হয়তো তখনও অপেক্ষা করব।

আরও ভালো চাকরির।

আরও বড় ফ্ল্যাটের।

এবং এভাবেই চলবে।

যতদিন না শেষ হয়।

এবং শেষ হলে দেখব, শুরুই হয়নি।

শুধু ছিল অপেক্ষা।

শুরুর।

যা কখনো এল না।

আত্মউপলব্ধি জীবনের-পাঠ বাস্তবতা মননশীলতা লক্ষ্য

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

জীবন

আয়না

অক্টোবর ২০২৫ · 7 মিনিটে পড়া

জীবন

বিদায়

অক্টোবর ২০২৫ · 8 মিনিটে পড়া

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *