ব্লগ

পারিবারিক গ্রুপের ভুয়া তথ্যবাহী

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

ফোনে নোটিফিকেশন। পারিবারিক হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে নতুন মেসেজ। খুলে দেখি মামা শেয়ার করেছেন একটা ছবি। লেখা আছে “প্রতিদিন সকালে লেবুর রস খেলে করোনা হয় না।” এবং নিচে লেখা “সবাইকে জানিয়ে দিন।” আমার মাথা ঘুরে যায়।

এই পারিবারিক গ্রুপে প্রতিদিন এমন কিছু না কিছু আসেই। কখনো “রসুনের অবিশ্বাস্য উপকারিতা,” কখনো “মোবাইল ফোনের বিকিরণ থেকে বাঁচার উপায়,” কখনো “যে খাবারগুলো কখনো খাবেন না।”

সবচেয়ে বেশি শেয়ার করেন আমার এক চাচা। তিনি যেন একটা নিউজ এজেন্সির মালিক। দিনে পাঁচ-ছয়টা “গুরুত্বপূর্ণ” তথ্য শেয়ার করেন। আর সবার শেষে লেখেন “পরিবারের সবাইকে জানিয়ে দিন।”

গতকাল এসেছিল “কালো জিরার চমত্কার উপকারিতা।” লেখা ছিল “এই তথ্য জানলে আপনি অবাক হয়ে যাবেন।” আমি পড়েই অবাক হয়ে গেছি। কারণ সেখানে দাবি করা হয়েছে কালো জিরা দিয়ে ক্যানসার সারানো যায়।

এই ধরনের তথ্যগুলো কোথা থেকে আসে? কে বানায় এসব? আর কেনইবা মানুষ বিনা যাচাই-বাছাই শেয়ার করে?

আমি একবার একটা ভুয়া তথ্যের বিপরীতে সত্য তথ্য শেয়ার করেছিলাম। কিন্তু তাতে কোনো লাইক বা কমেন্ট আসেনি। যেন সবাই মিথ্যা তথ্যই পছন্দ করে।

সবচেয়ে হাস্যকর ছিল “পিঁয়াজ কেটে ঘরে রাখলে সব ভাইরাস মারা যায়।” এই তথ্যটা আমার এক মাসি শেয়ার করেছিলেন। নিচে লিখেছিলেন “ডাক্তাররা এই তথ্য গোপন রাখে।”

আল্লাহর কাছে প্রশ্ন করি, “কেন মানুষ এত সহজে মিথ্যা তথ্যে বিশ্বাস করে? কেন যাচাই করে দেখে না?”

একদিন আরাশ বলল, “আব্বু, নানার পাঠানো সেই মেসেজ কি সত্যি? যেটায় বলেছে গরুর দুধে বিষ আছে।” আমি বুঝলাম এই ভুয়া তথ্যগুলো আমার সন্তানের মনেও প্রভাব ফেলছে।

পরিবারের কেউ যখন এসব শেয়ার করে, তখন সেটার প্রতিবাদ করা কঠিন। কারণ তাদের উদ্দেশ্য ভালো। তারা সবার উপকারের জন্যই শেয়ার করে।

কিন্তু এই “উপকারের” নামে কত ক্ষতি হচ্ছে। মানুষ ডাক্তারের পরামর্শ না নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপের ঔষধ খায়। ভুল তথ্যের ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়।

একবার এক চাচি শেয়ার করেছিলেন “লেবু আর মধু মিশিয়ে খেলে ওজন কমে।” তার মেয়ে সেটা বিশ্বাস করে মাসের পর মাস খেয়েছে। কিন্তু ওজন এক গ্রামও কমেনি।

সবচেয়ে বিপজ্জনক হয় চিকিৎসা সংক্রান্ত ভুয়া তথ্য। “এই পাতার রস খেলে ডায়াবেটিস সারে।” “এই তেল মাখলে বাত ব্যথা চলে যায়।” এসব দেখলে আমার রক্তচাপ বেড়ে যায়।

একদিন হ্যাপি বলল, “তুমি এত রেগে যাও কেন? তারা তো ভালো উদ্দেশ্যে শেয়ার করে।” আমি বললাম, “ভালো উদ্দেশ্য থাকলেই সব ঠিক হয়ে যায় না।”

কিন্তু আমিও কিছু করতে পারি না। পারিবারিক গ্রুপে কেউ কিছু বললে সেটা বিতর্কিত হয়ে যায়। “হায়দার নাকি আমাদের কথা বিশ্বাস করে না।”

মাঝে মাঝে ভাবি গ্রুপ ছেড়ে দেব। কিন্তু তাহলে পরিবারের সাথে যোগাযোগ থাকবে না। তাছাড়া গ্রুপে ভালো কিছুও আসে। জন্মদিনের শুভেচ্ছা, ঈদের উৎসব, পারিবারিক খবরাখবর।

এক মাস গ্রুপের সব মেসেজ মিউট করে রেখেছিলাম। কিন্তু তাতেও কাজ হয়নি। যখন আনমিউট করলাম, তখন ৫০০ টা মেসেজ জমে ছিল। তার মধ্যে ২০০ টাই ছিল ভুয়া তথ্য।

এখন একটা কৌশল শিখেছি। গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে আলাদা করে সেই আত্মীয়কে মেসেজ করি। “এই তথ্যটা সঠিক নয়।” কিন্তু সে আবার পরের দিন আরেকটা ভুয়া তথ্য শেয়ার করে।

হয়তো এটাই আমাদের সময়ের বৈশিষ্ট্য। তথ্যের এই যুগে মিথ্যা তথ্যেরও রাজত্ব। আর পরিবারের গ্রুপগুলো হয়ে উঠেছে এই মিথ্যা তথ্যের প্রধান আড্ডাস্থল।

আমার স্বপ্ন একদিন এমন একটা পারিবারিক গ্রুপ হবে যেখানে শুধু সত্য তথ্য শেয়ার করা হয়। কিন্তু সেই দিন হয়তো কখনোই আসবে না।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *