ব্লগ

যে বার্তা ভুল ঠিকানায় পৌঁছায়

নভেম্বর ২০২৫ · 5 মিনিটে পড়া
শেয়ার

গতকাল হ্যাপিকে যখন বললাম, “আমি তোমার জন্য চিন্তিত,” আজ সকালে দেখি আরাশ আমার দিকে অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে আছে। জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছে।

সে বলল, “মা বলেছে তুমি আমার জন্য চিন্তিত।”

আমি স্তব্ধ। আমি তো হ্যাপিকে বলেছিলাম তার জন্য চিন্তিত। কিন্তু সেই বার্তা পৌঁছেছে আরাশের কাছে।

হ্যাপি রান্নাঘর থেকে ডাকল, “তুমি কেন আরাশকে নিয়ে এত দুশ্চিন্তা করো? ওর কি কোনো সমস্যা আছে?”

আমার মাথা ঘুরতে লাগল। আমি একটা বার্তা পাঠিয়েছিলাম হ্যাপির কাছে। কিন্তু সেটা বিকৃত হয়ে আরাশের কাছে পৌঁছেছে, আর তার থেকে আবার ভুল বোঝাবুঝি হয়ে ফিরে এসেছে হ্যাপির কাছে।

এই যে আমার বার্তাগুলো সব সময় ভুল ঠিকানায় পৌঁছায়, এটা কি আমার সবচেয়ে বড় অভিশাপ?

সপ্তাহখানেক আগে অফিসে সহকর্মী রহিমকে বলেছিলাম, “তুমি ভালো কাজ করো।” আমার উদ্দেশ্য ছিল তাকে উৎসাহ দেওয়া। কিন্তু পরের দিন সাহেব আমাকে ডেকে বললেন, “রহিম বলেছে তুমি নাকি মনে করো অন্যরা খারাপ কাজ করে।”

আমার প্রশংসার বার্তা রহিমের কাছে পৌঁছেছে সমালোচনা হিসেবে। আর তার থেকে সাহেবের কাছে গেছে অভিযোগ হিসেবে।

এই কি আমার নিয়তি? আমি যা বলি, সেটা সবচেয়ে ভুল মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।

আমি ভালোবাসার কথা বলি, পৌঁছায় রাগের বার্তা হিসেবে।

আমি উৎসাহের কথা বলি, পৌঁছায় হতাশার বার্তা হিসেবে।

আমি আশার কথা বলি, পৌঁছায় ভয়ের বার্তা হিসেবে।

ছোটবেলায় একটা খেলা খেলতাম বন্ধুদের সাথে। “কানে কানে কথা” খেলা। একজন একটা কথা বলত পাশের জনের কানে। সেই কথা একজন থেকে আরেকজনের কাছে যেত। শেষে দেখা যেত, প্রথম যে কথা ছিল, শেষে সেটা একদম অন্য কিছু হয়ে গেছে।

তখন হাসতাম। এখন বুঝি, আমার পুরো জীবনটাই সেই “কানে কানে কথা” খেলার মতো। আমি যে বার্তা পাঠাই, সেটা এক থেকে আরেকের কাছে যেতে যেতে বিকৃত হয়ে যায়।

গত মাসে বন্ধু জামিউলকে ফোনে বলেছিলাম, “তোমার ব্যবসায় সফলতা কামনা করি।” পরদিন সাইফুল আমাকে ফোন করে বলল, “জামিউল বলেছে তুমি নাকি ভাবছ তার ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না।”

আমার আশীর্বাদ পৌঁছেছে সন্দেহের বার্তা হিসেবে।

এর চেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, আমি যাদের জন্য বার্তা পাঠাই না, তাদের কাছেও কোনো না কোনো বার্তা পৌঁছে যায়।

গত বছর আমার ছোট ভাইয়ের সাথে কোনো কথা হয়নি মাসখানেক। কিন্তু হঠাৎ একদিন ফোন করে বলল, “ভাই, তুমি কি আমার উপর রাগ করে আছো?”

আমি তো তাকে কোনো বার্তাই পাঠাইনি। কিন্তু আমার নিঃশব্দতাও একটা বার্তা হিসেবে পৌঁছেছে।

এই যে বার্তাগুলো নিজের মতো করে গন্তব্য ঠিক করে নেয়, এর পেছনে কী আছে? আমার ভাগ্য খারাপ? নাকি আমার ভেতরে এমন কোনো শক্তি আছে যেটা সব কিছু উল্টে দেয়?

রাতে একা বসে ভাবি, হয়তো আমার চারপাশে একটা অদৃশ্য আয়না আছে। আমি যে দিকে বার্তা পাঠাই, সেটা সেই আয়নায় প্রতিফলিত হয়ে অন্য দিকে চলে যায়।

অথবা আমার চারপাশে একটা ঘূর্ণিঝড় আছে। আমার প্রতিটি বার্তা সেই ঘূর্ণিঝড়ে পেঁচিয়ে যায়, আর অন্য কোনো দিক থেকে বেরিয়ে আসে।

নাকি সমস্যা আরো গভীরে? হয়তো আমি এমন একটা ভাষায় কথা বলি যেটার অনুবাদ সবাই ভুল করে।

কিংবা আমার কণ্ঠে এমন কিছু আছে যেটা শব্দের অর্থ বদলে দেয়।

আল্লাহ, আমি কি এমন একটা অভিশপ্ত মানুষ যার প্রতিটি বার্তা ভুল ঠিকানায় পৌঁছায়? যার ভালোবাসা পৌঁছায় ঘৃণা হিসেবে, যার দুঃখ পৌঁছায় খুশি হিসেবে?

নাকি এই পৃথিবীতে কোনো সঠিক ঠিকানাই নেই? সবাই ভুল ঠিকানায় বাস করি?

হয়তো আসল সমস্যা এই যে, আমি যাদের কাছে বার্তা পাঠাই, তারা আসলে আমার বার্তা গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত নয়। তাই সেগুলো অন্য কোথাও চলে যায়।

অথবা আমি নিজেই জানি না আমি কার কাছে বার্তা পাঠাচ্ছি। হয়তো আমার মন এক ঠিকানা ভাবে, কিন্তু আমার হৃদয় অন্য ঠিকানা খুঁজে।

রাত গভীর হলে মনে হয়, হয়তো আমার সব বার্তা ভুল ঠিকানায় না, বরং সঠিক ঠিকানায়ই পৌঁছায়। হয়তো আমি যে ঠিকানা ভাবি, সেটাই ভুল।

কিন্তু তাহলে সঠিক ঠিকানা কোনটা?

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *