ব্লগ

ভুতুড়ে ঘড়ি

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আজ রাতে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি রাত ২টা বেজে গেছে। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে সবেমাত্র রাত ৯টায় ফোন হাতে নিয়েছিলাম। এই পাঁচ ঘণ্টা গেল কোথায়? ইউটিউবে একটা ভিডিও দেখতে গিয়ে অন্য ভিডিও, সেখান থেকে আরেক ভিডিও। একটা খরগোশের গর্তে ঢুকে পড়েছিলাম যার শেষ নেই।

এই যে হারিয়ে যাওয়া ঘণ্টাগুলো, এগুলোর কী হিসাব দেব? আমার জীবন থেকে কেটে নেওয়া সময়, যেখানে কোনো স্মৃতি নেই, কোনো অর্জন নেই। শুধু একটা অস্পষ্ট ঝাপসা অনুভূতি যে “কিছু একটা দেখেছি।”

কিন্তু সকালে ঘুম থেকে উঠে আরাশের কাছে গিয়ে দেখি সে কি একটা ছবি আঁকছে। “কী আঁকছিস?”

“বাবা, গতকাল রাতে একটা ভিডিও দেখেছিলাম জাপানি শিল্পী হোকুসাই সম্পর্কে। তার ‘দ্য গ্রেট ওয়েভ’ এর স্টাইলে আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তাটা আঁকছি।”

আমার ভিতরে একটা অ্যাপ রিস্টার্ট হলো। নাম “বিস্ময় আনলিমিটেড এডিশন”।

“তুই তো সারারাত ইউটিউবে ছিলি। সেটা নষ্ট সময় না?”

“বাবা, আমি জানতামই না হোকুসাই কে। এখন তার কাজ দেখে আমার নিজের আর্ট আরও ভালো হচ্ছে। এই পাঁচ ঘণ্টায় আমি তিনশো বছরের পুরনো একজন শিল্পীর সাথে বন্ধুত্ব করেছি।”

আমি বুঝলাম আমার “হারিয়ে যাওয়া” সময় আরাশের কাছে “খুঁজে পাওয়া” সময়।

অফিসে জামিউরের সাথে এই নিয়ে কথা বলছিলাম। সে বলল, “হায়দার ভাই, আপনি কি জানেন আমি গত সপ্তাহে ফেসবুকে সাত ঘণ্টা কাটিয়েছি? মনে হচ্ছিল সময় নষ্ট করছি। কিন্তু সেখানে আমার স্কুলের এক বন্ধুর সাথে দেখা, যার বাবা ক্যান্সারে মারা গেছে। আমি তাকে সাপোর্ট দিতে পেরেছি।”

“তার মানে?”

“মানে হলো, ইন্টারনেটে হারিয়ে যাওয়া মানেই সময় নষ্ট নয়। কখনো কখনো সেটা মানুষের সাথে পুনরায় সংযোগ।”

ফিরে এসে হ্যাপিকে বললাম, “তুই তো রান্নার রেসিপি ভিডিও দেখে দেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাস।”

“হ্যাঁ। কিন্তু সেই ভিডিও দেখে আমি তোদের জন্য নতুন নতুন খাবার বানাতে পারি। তোর মুখে হাসি দেখি। সেই ঘণ্টাগুলো কি নষ্ট?”

আমি ভাবলাম। আমি যে পাঁচ ঘণ্টা ইউটিউবে কাটিয়েছি, সেখানে কী দেখেছিলাম? একটা পুরনো গানের ভিডিও, যেটা আমার কলেজ জীবনের কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল। একটা লেকচার, যেটা আমাকে নতুন একটা চিন্তা দিয়েছে। কিছু মজার ভিডিও, যেগুলো আমার মন ভালো করে দিয়েছে।

তাহলে এই সময়টা কি সত্যিই হারিয়ে গেছে? নাকি আমি নিজেকে খুঁজে পেয়েছি?

রাতে নামাজ পড়ে ভাবছিলাম, আমার বাবা যখন বেঁচে ছিলেন, তিনি সন্ধ্যায় বসে থাকতেন। কখনো আকাশের দিকে তাকিয়ে, কখনো বারান্দায় পায়চারি করে। আমরা বলতাম তিনি “সময় নষ্ট করছেন।” কিন্তু পরে বুঝেছি, তিনি আসলে নিজের সাথে কথা বলছিলেন। আল্লাহর সাথে নীরব কথোপকথন।

ইন্টারনেটে “হারিয়ে যাওয়া”টাও কি এক ধরনের নীরব যোগাযোগ? নিজের আগ্রহ, কৌতূহল, আবেগের সাথে কথা বলা?

কিন্তু একটা ভয়ও আছে। কখনো কখনো আমি ইন্টারনেটে ঢুকি দুঃখ ভুলতে। নতুন চাকরি খুঁজতে গিয়ে হতাশ হয়ে ভিডিও দেখি। সেটা কি পলায়ন?

আরাশকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুই কীভাবে বুঝিস কখন ইন্টারনেটে সময় কাটানো ভালো আর কখন খারাপ?”

“বাবা, যখন আমি কিছু শিখি বা অনুভব করি, সেটা ভালো। আর যখন শুধু ভুলে থাকার জন্য দেখি, সেটা খারাপ।”

“আরেকটা প্রশ্ন। তুই যখন অনলাইনে থাকিস, তখন কি মনে হয় তুই একা?”

“না বাবা। মনে হয় পুরো পৃথিবীটা আমার বন্ধু। কিন্তু যখন ফোন বন্ধ করি, তখন একটু একা লাগে।”

আমি বুঝলাম। ইন্টারনেটে হারিয়ে যাওয়া মানে হয়তো নিজেকে খুঁজে পাওয়া। সারা পৃথিবীর মানুষের চিন্তা, অনুভূতি, সৃষ্টি দেখে নিজের জায়গা বোঝা।

কিন্তু হিসাবটা কী? এই ঘণ্টাগুলো জীবনের ডেবিট নাকি ক্রেডিট?

উত্তর হয়তো এই: যদি এই সময়ে আমি আরো মানুষ হয়ে উঠি, আরো বুঝি, আরো অনুভব করি – তাহলে সেটা পাওয়া সময়। আর যদি আমি আরো অসাড় হয়ে যাই, তাহলে সেটা হারানো সময়।

ঘড়ি ভুতুড়ে হয় না। আমাদের মন ভুতুড়ে হয়।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *