আরাশের হাঁচি-কাশি শুরু হতেই আমি গুগল করলাম – “বাচ্চাদের ঠান্ডা লাগলে করণীয়।” তারপর ইউটিউবে গিয়ে সার্চ করলাম – “শিশুদের সর্দি-কাশির ঘরোয়া চিকিৎসা।”
প্রথম ভিডিওটাই দেখলাম। একজন ডাক্তার বলছেন – মধু, আদা, তুলসী পাতা দিয়ে কাঢ়া বানিয়ে খাওয়ান। আমি নোট নিলাম।
হ্যাপি বলল, “ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হয় না?” আমি বললাম, “আগে দেখি, এই পদ্ধতিতে ভালো হয় কিনা।”
দ্বিতীয় ভিডিও দেখলাম – আরেক ডাক্তার বলছেন গরম পানিতে লবণ দিয়ে গড়গড়া করাতে। তৃতীয় ভিডিওতে বলা হল – পেয়াজের রস কার্যকর। চতুর্থ ভিডিওতে – রসুন পানিতে সিদ্ধ করে।
আমি যত বেশি ভিডিও দেখছি, তত বেশি নিজেকে একজন বিশেষজ্ঞ মনে হচ্ছে। কয়েক ঘন্টা ইউটিউব দেখার পর আমি ভাবলাম – আমিই তো আরাশের সবচেয়ে ভালো চিকিৎসক।
মধু, আদা, তুলসী দিয়ে কাঢ়া বানিয়ে আরাশকে খাওয়ালাম। ও মুখ বিকৃত করল, “বাবা, খুব তেতো।” আমি বললাম, “ওষুধ তো তেতোই হয়।”
রাতে আরাশের জ্বর বাড়ল। আমি আবার ইউটিউবে সার্চ করলাম – “বাচ্চাদের জ্বর কমানোর উপায়।” একটা ভিডিওতে দেখলাম – কপালে ভেজা কাপড় দিতে। আরেকটাতে – গায়ে মালিশ করতে।
আমি সারারাত আরাশের সেবা করলাম। নিজেকে মনে হচ্ছিল একজন দক্ষ চিকিৎসকের মতো। হ্যাপি বলল, “হায়দার, ডাক্তারের কাছে যাই।” আমি বললাম, “আরেকটু দেখি।”
সকালে আরাশের অবস্থা আরো খারাপ। শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। আমি প্যানিক করে গেলাম। হ্যাপি বলল, “চল, এখনই ডাক্তারের কাছে যাই।”
ডাক্তার দেখে বললেন – “নিউমোনিয়ার লক্ষণ। আগে আনলে ভালো হত।” আমার মাথায় যেন বাজ পড়ল। আমার ইউটিউব বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি ব্যর্থ হয়ে গেল।
ডাক্তার বললেন, “বাচ্চাদের ক্ষেত্রে ঘরোয়া টোটকা ঝুঁকিপূর্ণ। ইন্টারনেটে যা দেখেন, সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।” আমি মাথা নিচু করে রইলাম।
হাসপাতালে বসে ভাবলাম – আমি কী করেছি? ইউটিউবে কয়েক ঘন্টা ভিডিও দেখে ভেবেছি ডাক্তারের ৮ বছরের পড়াশোনা আর ১০ বছরের অভিজ্ঞতার সমান হয়ে গেছি?
একটা ভিডিও দেখে আমি ভেবেছিলাম সব জানি। কিন্তু বাস্তবে আমি জানতাম না – কোন উপসর্গটা স্বাভাবিক, কোনটা বিপজ্জনক। কখন অপেক্ষা করতে হয়, কখন দৌড়াতে হয়।
আরাশ সুস্থ হয়ে উঠল। কিন্তু আমার মনে দাগ কেটে গেল। আমি বুঝলাম – তথ্য আর জ্ঞান এক জিনিস নয়। ইউটিউবে অনেক তথ্য আছে, কিন্তু সেই তথ্য কিভাবে প্রয়োগ করতে হয়, কোন পরিস্থিতিতে কোনটা ব্যবহার করতে হয় – সেটাই আসল জ্ঞান।
এখন আরাশের সামান্য অসুস্থতাতেও আমি ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই। ইউটিউব দেখি, কিন্তু সেটাকে ডাক্তারের বিকল্প ভাবি না। সহায়ক ভাবি।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় – এই সহজলভ্য তথ্যের যুগে আমরা কি সত্যিকারের বিশেষজ্ঞতাকে অবমূল্যায়ন করে ফেলছি?
একটু ভাবনা রেখে যান