ব্লগ

যাকাত দেওয়া আর নেওয়ার মানসিক জটিলতা

নভেম্বর ২০২৫ · 5 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আজ যাকাত দেওয়ার সময়। গত এক বছরে যা আয় হয়েছে, তার ২.৫% দিতে হবে। হিসাব করে দেখেছি, ৮ হাজার টাকা।

৮ হাজার টাকা। আমার দেড় মাসের বাজার।

এই টাকা দিতে মন চাইছে না। মনে হচ্ছে আমার নিজেরই এত অভাব, আমি কেন দেব?

কিন্তু এটা ইসলামের নিয়ম। ফরজ। না দিলে গুনাহ।

দ্বিধার মধ্যে পড়ে গেছি।

হ্যাপিকে বলেছি। হ্যাপি বলেছে, “দাও। আল্লাহ আরো দেবেন।”

কিন্তু কোথায় দেব? কাকে দেব?

পাড়ার রশিদ মিয়া খুব গরিব। তার ছেলেমেয়ে অনেক। কিন্তু তিনি কাজ করতে পারেন। তাহলে তিনি কি যাকাতের হকদার?

নাকি যাকাত শুধু সেইসব গরিবদের যারা একদমই কাজ করতে পারে না?

এই নিয়ে আমার সঠিক ধারণা নেই।

ইন্টারনেটে সার্চ করেছি। দেখেছি যাকাতের ৮টি খাত আছে। ফকির, মিসকিন, আমিল, মুআল্লাফাতুল কুলুব, দাস মুক্ত করা, ঋণগ্রস্ত, আল্লাহর পথে, মুসাফির।

এর মধ্যে আমার পাড়ায় কে কোন খাতে পড়ে?

রশিদ মিয়া মিসকিন। কিন্তু তার কি ঋণ আছে? জানি না।

কবির চাচা অসুস্থ। কাজ করতে পারেন না। তিনি ফকির। কিন্তু তার ছেলেরা কামাই করে। তাহলে তিনি যাকাত পাবেন?

এসব হিসাব মাথায় রাখতে গিয়ে মাথা ব্যথা হয়ে যায়।

সবচেয়ে সহজ হয় মসজিদে দিয়ে দেওয়া। ইমাম সাহেব ভাগ করে দেবেন।

কিন্তু তিনি কি সঠিকভাবে ভাগ করবেন? এই নিয়ে সন্দেহ আছে।

গত বছর শুনেছি, এক ইমাম সাহেব যাকাতের টাকা নিজের কাজে ব্যবহার করেছেন।

তাহলে আমার যাকাত কি সঠিক জায়গায় পৌঁছাবে?

এই দ্বিধা নিয়ে আমি নিজেই খোঁজ নিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

কিন্তু যাকাত দেওয়ার সময় আরেকটা সমস্যা হয়। মানসিক সমস্যা।

আমি যার কাছে যাকাত নিয়ে যাই, তার কাছে মনে হয় আমি খুব বড় দাতা। আমি যেন তার উপকার করছি।

এই অহংকার ভাব আসে। এটা কি ঠিক?

যাকাত তো আমার টাকা নয়। এটা আল্লাহর নির্ধারিত হক। গরিবদের অধিকার।

আমি শুধু পৌঁছে দিচ্ছি। এখানে অহংকারের কিছু নেই।

কিন্তু মন সেটা মানে না।

আবার যে গ্রহণ করে, তার মানসিক অবস্থাও ভাবি। সে কেমন লাগে যাকাত নিয়ে?

আমি যদি কারো মুখোমুখি হয়ে যাকাত দিই, তাহলে তার আত্মসম্মানে লাগে না তো?

ইসলামে বলা আছে, যাকাত দেওয়ার সময় গ্রহীতার মন রক্ষা করতে হবে। তাকে ছোট করা যাবে না।

কিন্তু ব্যবহারিক ক্ষেত্রে এটা কতটুকু মানা হয়?

গত বছর আমি রশিদ মিয়াকে যাকাত দিয়েছিলাম। তিনি নিয়েছেন। কিন্তু তার চোখে একটা লজ্জা দেখেছি।

মানুষ অন্যের সাহায্য নিতে চায় না। নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়।

কিন্তু যখন বাধ্য হয়ে নিতে হয়, তখন কেমন লাগে?

আমি নিজে কখনো যাকাত নিইনি। কিন্তু যদি কখনো পরিস্থিতি এমন হয় যে নিতে হয়?

যদি আমার চাকরি চলে যায়? যদি আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি? তখন কি আমিও যাকাত নেব?

এই চিন্তা করতে ভালো লাগে না। কিন্তু সম্ভাবনা আছে।

যাকাত একটা সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। যার আছে সে দেবে। যার নেই সে নেবে।

কিন্তু এই নেওয়া-দেওয়ার মানসিক দিক খুব জটিল।

দাতা মনে করে সে অনুগ্রহ করছে। গ্রহীতা মনে করে সে অপমানিত হচ্ছে।

দুটোই ভুল ধারণা।

যাকাত কোনো অনুগ্রহ নয়। এটা অধিকার।

আবার যাকাত নেওয়া কোনো অপমান নয়। এটা প্রয়োজন।

কিন্তু সমাজ এই সত্যগুলো বোঝে না।

আমি যখন যাকাত দিই, চেষ্টা করি যেন গ্রহীতার মনে কষ্ট না হয়। বলি, “এটা আল্লাহর তরফ থেকে।”

কিন্তু ভিতরে ভিতরে একটা শ্রেষ্ঠত্বের ভাব চলে আসে।

এই ভাবটা ভুল। এটা যাকাতের সওয়াব নষ্ট করে দেয়।

কোরআনে আছে, “যারা আল্লাহর পথে খরচ করে তারপর খোঁটা দেয় না বা কষ্ট দেয় না।”

আমি খোঁটা দিই না। কিন্তু মনে মনে একটা গর্ব থেকে যায়।

আল্লাহর কাছে দোয়া করি, আমি যেন সঠিক নিয়তে যাকাত দিতে পারি। অহংকার ছাড়া।

আর যদি কখনো নিতে হয়, যেন সেটাও সঠিক নিয়তে নিতে পারি। লজ্জা ছাড়া।

কারণ যাকাত একটা ইবাদত। দেওয়াও ইবাদত, নেওয়াও ইবাদত।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *