ব্লগ

অসমাপ্ত বাক্যের সংকলন

নভেম্বর ২০২৫ · 7 মিনিটে পড়া
শেয়ার

অসমাপ্ত বাক্য

আমার প্রিয় কবি মারা গেলেন সাতাশ বছর বয়সে। ফুসফুসে যক্ষ্মা, সেই পুরনো রোগ যা কবিদের বড় বেশি ভালোবাসে। তার শেষ কবিতাটি পাওয়া গেল টেবিলে — অসমাপ্ত, কালির দাগ শুকিয়ে গেছে, পাশে অর্ধেক খাওয়া চায়ের কাপ। শেষ লাইনটি এভাবে শেষ হয়েছে: “আমি বলতে চেয়েছিলাম…” তিনটি বিন্দু। তারপর শূন্যতা। বলতে চেয়েছিলেন কী? কোন সত্য? কোন স্বীকারোক্তি? কোন প্রেম যা সারাজীবন গোপন রেখেছিলেন? সেটা আর কখনো জানা হবে না। সেই তিনটি বিন্দু চিরকাল ঝুলে থাকবে শূন্যতায় — একটা প্রশ্ন যার উত্তর মহাবিশ্বের কোথাও নেই।

গতকাল রাস্তায় দুর্ঘটনা দেখলাম। মোটরসাইকেল আর ট্রাক। একুশ বছরের ছেলে — সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল কলেজে যাবে বলে। মা হয়তো বলেছিলেন সাবধানে যাস, সে হয়তো বলেছিল আম্মা চিন্তা করো না। এখন সে রাস্তায় পড়ে আছে, তার চারপাশে ভিড়, কেউ অ্যাম্বুলেন্স ডাকছে, কিন্তু দেরি হয়ে গেছে। তার পকেট থেকে পাওয়া গেল একটা চিরকুট — ভাঁজ করা, যত্ন করে রাখা। কাঁপা কাঁপা হাতে কেউ খুলল। সেখানে লেখা: “আম্মা, আজ তোমাকে বলব যে…” বাক্য শেষ হয়নি। কী বলতে চেয়েছিল? ভালোবাসি? ধন্যবাদ? নাকি কোনো গোপন কথা যা বুকে চেপে রেখেছিল বহুদিন? মা কোনোদিন জানতে পারবে না। সেই চিরকুটটা এখন তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ — এবং সবচেয়ে বড় অভিশাপ।

আমার কলেজের বন্ধু রাহাত। ক্যান্সার ধরা পড়ল বাইশে, চলে গেল চব্বিশে। শেষ কয়েক মাস হাসপাতালে কাটিয়েছে — টিউব, মেশিন, ওষুধের গন্ধ। আমি দেখতে গিয়েছিলাম একদিন। সে আমার হাত ধরে বলেছিল, চোখে একটা অদ্ভুত আলো, “যদি বাঁচতাম, তাহলে…” তারপর থেমে গেল। হয়তো শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল, হয়তো কথা খুঁজে পাচ্ছিল না, হয়তো বুঝতে পেরেছিল কিছু বললেও লাভ নেই। তাহলে কী? কী করত সে? বিয়ে করত? বিদেশে যেত? বড় কিছু হতো? তার স্বপ্নগুলো মরে গেল তার সাথে — কবর দেওয়া হলো সেই চব্বিশ বছরের শরীরের সাথে, যেখানে এত সম্ভাবনা ছিল, এত ভবিষ্যৎ ছিল।

রাতে বিছানায় শুয়ে ভাবি — আমার যদি কাল হার্ট অ্যাটাক হয়? হঠাৎ, কোনো সতর্কতা ছাড়া, যেমন হয় অনেকের। সকালে চা খেতে খেতে বুকে ব্যথা, তারপর অন্ধকার। আরাশকে শেষ কী বলব? হয়তো বলতে শুরু করব: “বাবা তোমায়…” তারপর? শ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে। বাক্য অসমাপ্ত থাকবে। আরাশ সারাজীবন ভাববে — বাবা কী বলতে চেয়েছিল? ভালোবাসি? গর্বিত? নাকি অন্য কিছু — কোনো গোপন কথা, কোনো উপদেশ, কোনো সতর্কতা? সে কখনো জানবে না।

অকাল মৃত্যুর সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি এটা নয় যে জীবন ছোট হয়ে যায়। জীবন তো সবারই শেষ হয় — কারো আগে, কারো পরে। ট্র্যাজেডি এটা যে কত কিছু অব্যক্ত রয়ে যায়। কত ভালোবাসা যা বুকে পুষে রাখা হয়েছিল সঠিক সময়ের অপেক্ষায় — সেই সময় আর এল না। কত স্বপ্ন যা পরের বছর, পরের মাসে পূরণ করব ভাবা হয়েছিল — পরের মাস আর এল না। কত ক্ষমা চাওয়া বাকি ছিল, কত ধন্যবাদ বলা হয়নি, কত আলিঙ্গন স্থগিত রাখা হয়েছিল ব্যস্ততার অজুহাতে।

আমার ডায়েরির পাতায় লেখা আছে অসংখ্য অসমাপ্ত পরিকল্পনা। “আগামীকাল হ্যাপিকে বলব যে সেদিন রাগ করে যা বলেছিলাম সেটা ঠিক হয়নি…” “পরের মাসে আরাশকে নিয়ে কক্সবাজার যাব, অনেকদিন ছুটি নেওয়া হয় না…” “বছর শেষে মা-বাবার কবরে যাব, দুই বছর হয়ে গেল যাওয়া হয়নি…” সব স্থগিত। সব আগামীকালের জন্য রাখা। কিন্তু আগামীকাল যদি না আসে? যদি আজ রাতেই আমার বুকে চাপ ধরে, যদি আজ রাতেই শেষ নিঃশ্বাস? তাহলে এই সব পরিকল্পনা থাকবে ডায়েরির পাতায় — কালির দাগ, যার কোনো মূল্য নেই।

প্রতিটি অকাল মৃত্যু একটি অসমাপ্ত উপন্যাস। প্রধান চরিত্র হঠাৎ উধাও হয়ে যায় মাঝপথে — কোনো সমাপ্তি নেই, কোনো উপসংহার নেই। পাঠক বসে থাকে বই হাতে, ভাবে — এরপর কী হতো? নায়ক কি তার প্রেম পেত? খলনায়ক কি শাস্তি পেত? গল্পের মোড় কোথায় ঘুরত? কিন্তু লেখক চলে গেছেন। কলম রেখে দিয়েছেন চিরকালের জন্য। গল্পের শেষটা কেউ কোনোদিন জানবে না।

আমার প্রতিবেশীর মেয়ে তানিয়া। আঠারো বছর বয়স, এইচএসসি পরীক্ষার্থী। পরীক্ষার আগের রাতে হঠাৎ জ্বর এল — সাধারণ জ্বর মনে করে প্যারাসিটামল খাইয়ে শুইয়ে দেওয়া হলো। সকালে আর উঠল না। ডেঙ্গু, অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ, কিছুই করার ছিল না। তার পড়ার টেবিলে খোলা বই, বইয়ের পাতায় পেন্সিলে লেখা: “পরীক্ষা শেষে আমি…” বাক্য শেষ হয়নি। কী করত সে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতো? বান্ধবীদের সাথে ট্যুরে যেত? প্রেমিককে হ্যাঁ বলত যে এতদিন অপেক্ষায় রেখেছিল? স্বপ্নগুলো সব অসমাপ্ত রয়ে গেল — সেই বইয়ের পাতায়, সেই পেন্সিলের দাগে।

অকাল মৃত্যুর কাব্য হচ্ছে অসম্পূর্ণতার কাব্য। যেমন একটা বাগানে গোলাপ ফোটার আগেই কেঁচি এসে কেটে ফেলে কুঁড়ি — সে কোনোদিন জানবে না তার রঙ কেমন হতো, তার গন্ধ কেমন হতো। যেমন একটা গান গাওয়ার আগেই গায়কের গলা থেমে যায় — সুর ভাসতে থাকে শূন্যে, কোনো কান তাকে ধরতে পারে না। যেমন একটা চিঠি লেখার আগেই কালি শুকিয়ে যায় কলমে — যা বলার ছিল তা থেকে যায় অন্তরে, কাগজে পৌঁছায় না কখনো।

আমি রাতে জেগে থেকে ভাবি এই সব কথা। ভাবি আমার জীবনটাও যদি অসমাপ্ত রয়ে যায়? হ্যাপি কোনোদিন জানবে না যে আমি তাকে কতটা ভালোবাসি — কারণ আমি বলিনি, মনে করেছি সে তো জানেই। আরাশ জানবে না যে সে আমার সবচেয়ে বড় গর্ব, আমার সবচেয়ে বড় অর্জন — কারণ আমি বলিনি, মনে করেছি পরে বলব। আমার বন্ধুরা জানবে না যে তাদের ছাড়া আমার জীবন কত শূন্য হতো — কারণ পুরুষ পুরুষকে এসব বলে না, লজ্জা লাগে।

তাই আজ থেকে একটা সিদ্ধান্ত নিলাম। কোনো বাক্য অসমাপ্ত রাখব না। যা বলার আজই বলব। কোনো ভালোবাসা অব্যক্ত রাখব না। যাকে ভালোবাসি তাকে জানাব, আজই, এখনই। কোনো ক্ষমা অনুচ্চারিত রাখব না। যার কাছে ক্ষমা চাওয়া দরকার, আজই চাইব। কারণ কাল হয়তো… না। এই বাক্যটাও অসমাপ্ত রাখতে চাই না। কারণ কাল হয়তো আমার সব কথা বলার সুযোগ থাকবে না। কাল হয়তো আমিও হয়ে যাব আরেকটা অসমাপ্ত গল্প।

অকাল মৃত্যু আমাদের একটা কঠিন সত্য শেখায়। প্রতিটি দিন শেষ দিন হতে পারে — তাই প্রতিটি দিনকে পূর্ণ করে বাঁচো। প্রতিটি কথা শেষ কথা হতে পারে — তাই এমন কথা বলো যা শেষ কথা হলেও তুমি গর্বিত থাকবে। প্রতিটি আলিঙ্গন শেষ আলিঙ্গন হতে পারে — তাই জড়িয়ে ধরো এমনভাবে যেন এটাই শেষবার।

আমি চাই আমার জীবনের শেষ লাইন কোনো বিন্দু দিয়ে শেষ না হোক। চাই সেখানে থাকুক একটা দাঁড়ি — পূর্ণ, সম্পূর্ণ, কিছু বাকি নেই। চাই আমার শেষ বাক্য হোক: “আমি যা বলতে চেয়েছিলাম, সব বলে গেছি।”

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *