ব্লগ

একতরফা বিচ্ছেদের ক্ষমতা

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

গতকাল আদালতে একটি কাজে গিয়েছিলাম। ওকিল সাহেবের অফিসে বসে আছি এমন সময় একটি মেয়ে এলো। কান্নাকাটি করতে করতে বলল, “স্যার, আমার স্বামী আমাকে তালাক দিয়েছে ফোনে। এক মিনিটে আমার পুরো জীবন শেষ। আমি কী করব?”

ওকিল সাহেব বললেন, “বোন, ইসলামী আইনে পুরুষেরই তালাকের অধিকার। তুমি শুধু ‘খোলা’ বা ‘মুবারাত’ চাইতে পার।”

“খোলা মানে কী?” মেয়েটি জিজ্ঞেস করল।

“স্বামীর কাছে গিয়ে অনুরোধ করবে যেন সে তোমাকে ছেড়ে দেয়। সে রাজি না হলে কিছু করার নেই।”

আমার মন খারাপ হয়ে গেল। এই মেয়েটির কোনো অধিকার নেই নিজের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার?

বাসায় ফিরে হ্যাপিকে বললাম। হ্যাপি বলল, “এটা তো অন্যায়। একটা সম্পর্ক তো দুই জনের। একজনের ইচ্ছায় কেন হবে?”

রাতে ইন্টারনেটে খোঁজ নিয়ে দেখলাম এই বিষয়ে অনেক আলোচনা আছে। কিছু স্কলার বলেছেন, কুরআনে তালাকের বিধান আসলে উভয়ের সম্মতিতে।

কুরআনে বলা হয়েছে (বাকারা ২:২২৯), “তালাক প্রত্যাহারযোগ্য দু’বার, তারপর হয় সুন্দরভাবে রেখে দেওয়া অথবা সুন্দরভাবে ছেড়ে দেওয়া।”

এখানে ‘ইমসাক বিল মারুফ’ (সুন্দরভাবে রেখে দেওয়া) এবং ‘তাসরিহ বিল ইহসান’ (সুন্দরভাবে ছেড়ে দেওয়া) – দুটোতেই পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্মতির কথা বোঝানো হয়েছে।

আরো পড়লাম, ইমাম আবু হানিফার মতে মেয়েরা বিবাহের চুক্তিতে শর্ত রাখতে পারে যে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সে নিজেই তালাক দিতে পারবে। একে বলা হয় ‘তাফউইদ’।

রসুল (সা) এর সময়ে বারিরা নামে এক দাসী ছিল। সে মুক্ত হওয়ার পর তার স্বামীকে ছেড়ে দিতে চেয়েছিল। রসুল (সা) তাকে এই অধিকার দিয়েছিলেন।

থাবিত ইবন কায়েস এর স্ত্রী জমিলা রসুল (সা) এর কাছে এসে বলেছিলেন যে তিনি স্বামীকে পছন্দ করেন না। রসুল (সা) তাদের খোলা (পারস্পরিক বিচ্ছেদ) এর অনুমতি দিয়েছিলেন।

তাহলে কেন আজকে মনে করা হয় শুধু পুরুষেরই তালাকের অধিকার আছে?

আমি ভাবি, একটি নারী যদি স্বামীর নির্যাতন সহ্য করতে না পারে, যদি সে অসুখী হয়, তাহলে তাকে কেন সারাজীবন সেই সম্পর্কে আটকে থাকতে হবে? এটা কি ন্যায়বিচার?

কুরআনেই তো বলা আছে (রুম ৩০:২১), “তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।” ভালোবাসা যদি শেষ হয়ে যায়, তাহলে সে সম্পর্ক রাখার অর্থ কী?

আরাশ জিজ্ঞেস করল, “আব্বু, তুমি আর আম্মু যদি কখনো আলাদা হতে চাও, তাহলে কী হবে?”

আমি বললাম, “আমরা তো সিদ্ধান্ত নেব একসাথে। কিন্তু এমন একটা সিস্টেম ন্যায্য নয় যেখানে একজনের ইচ্ছায় সব ঠিক হয়, আরেকজনের মত গুরুত্বপূর্ণ নয়।”

হ্যাপি বলল, “আমার মনে হয় বিয়ে যেহেতু দুজনের সম্মতিতে, তালাকও দুজনের সম্মতিতে হওয়া উচিত।”

বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভাবি। আল্লাহ কি চান যে একটি নারী অসুখী বিবাহিত জীবন কাটাক কারণ তার স্বামী তাকে ছাড়তে চায় না? নাকি তিনি চান উভয়ে সুখে থাকুক?

আমার বিশ্বাস, সত্যিকারের ইসলামী বিধান হলো ন্যায্যতার উপর প্রতিষ্ঠিত। একতরফা ক্ষমতা কখনো ন্যায্য হতে পারে না।

যারা বলেন শুধু পুরুষেরই তালাকের অধিকার, তারা আসলে নারীকে পুরুষের সম্পত্তি মনে করেন। কিন্তু ইসলামে নারী-পুরুষ সমান মর্যাদার অধিকারী।

আমি চাই আরাশ বড় হয়ে বুঝুক – বিয়ে একটি পার্টনারশিপ, মালিক-দাসত্বের সম্পর্ক নয়।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *