একই ছাদের নিচে
সেদিন রাতে খাবার টেবিলে আমরা পাঁচজন বসেছিলাম। কিন্তু কেউ কারো চোখের দিকে তাকাচ্ছিলাম না। থালায় মাছের ঝোল, ভাত, সবজি—সব আছে। শুধু নেই কথা। সেই নীরবতার স্বাদ এখনো মুখে লেগে আছে।
বাবা মাকে কিছু একটা বলেছিলেন বিকেলে। কী বলেছিলেন মনে নেই। হয়তো টাকার কথা, হয়তো কাজের কথা, হয়তো এমন কিছু যা আসলে বড় কোনো বিষয়ই ছিল না। কিন্তু সেই ছোট কথা থেকে বড় ঝগড়া। তারপর ঠান্ডা যুদ্ধ। মা রান্নাঘরে। বাবা বারান্দায়। আমি আর ছোট বোন দেয়া মাঝখানে—দুই দেশের সীমান্তে দাঁড়ানো শরণার্থীর মতো।
এই দৃশ্য আমাদের বাসায় নতুন না। তোমাদের বাসায়ও হয়তো নতুন না। পরিবার মানেই এরকম—ভালোবাসা আছে, কিন্তু মাঝে মাঝে সেই ভালোবাসাই সবচেয়ে বড় অস্ত্র হয়ে যায়।
দেয়ার বয়স তখন সাত। সে বুঝত না বাবা-মা কেন কথা বলছে না। একদিন আমাকে জিজ্ঞেস করল, “ভাইয়া, বাবা-মা কি আমাকে ভালোবাসে না? আমার জন্য কি ঝগড়া করে?” সেদিন বুকটা ভেঙে গিয়েছিল। একটা সাত বছরের বাচ্চা নিজেকে দোষী ভাবছে বড়দের ঝগড়ায়। কী উত্তর দেব? বললাম, “না মা, তোর জন্য না। বড়রা মাঝে মাঝে এমন করে। ঠিক হয়ে যাবে।”
কিন্তু ভেতরে ভেতরে জানতাম, এই “ঠিক হয়ে যাওয়া” আসলে কতটা কঠিন।
পরিবারের ঝগড়া বাইরের ঝগড়ার মতো না। বাইরে কেউ কষ্ট দিলে এড়িয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু পরিবার? পরিবারকে এড়াবে কোথায়? একই ছাদের নিচে থাকো। একই টেবিলে খাও। একই বাথরুম শেয়ার করো। পালানোর জায়গা নেই। তাই কষ্টটাও বেশি। আঘাতটাও গভীর।
আমার বন্ধু রিফাতের বাবা-মা আলাদা হয়ে গেছে দুই বছর আগে। সেদিন রিফাত আমাকে বলেছিল, “জানিস, ঝগড়া করত তখন অন্তত একসাথে ছিল। এখন ঝগড়াও নেই, কেউ নেই।” ওই কথাটা শুনে বুঝেছিলাম, ঝগড়া মানে শেষ না। ঝগড়া মানে এখনো চেষ্টা আছে। যেদিন চেষ্টাই থাকবে না, সেদিন সত্যিকারের শেষ।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, ঝগড়া হয় কেন? আমি আমার বাবা-মাকে দেখেছি। তোমাদের বাবা-মাকে দেখেছি। প্রায় সব পরিবার দেখেছি। কিছু প্যাটার্ন আছে।
টাকা। এটা সবচেয়ে বড় কারণ। মাস শেষে যখন হিসাব মেলে না, তখন দোষারোপ শুরু হয়। “তুমি বেশি খরচ করো।” “তুমি কম আয় করো।” এই কথাগুলো ছুরির মতো কাটে। কারণ টাকার অভাব মানে শুধু টাকার অভাব না, এটা একটা মানুষের আত্মসম্মানে আঘাত।
তারপর আসে ইগো। “আমি সারাদিন অফিস করি।” “আমি সারাদিন সংসার সামলাই।” দুজনেই ক্লান্ত। দুজনেই মনে করে তার কষ্টটা বেশি। কেউ স্বীকার করতে রাজি না যে অন্যজনও কষ্ট পাচ্ছে।
আর সবচেয়ে বড় কারণ—ভুল বোঝাবুঝি। বাবা হয়তো বলতে চাইলেন “আমি চিন্তিত।” মা শুনলেন “আমি অভিযোগ করছি।” মা হয়তো বলতে চাইলেন “একটু সময় দাও।” বাবা শুনলেন “তুমি যথেষ্ট না।” একই কথা, দুই অর্থ। তারপর শুরু হয় যুদ্ধ।
আমি নিজে এখন বিয়ে করেছি। স্ত্রী তামান্না। আমাদের মধ্যেও ঝগড়া হয়। প্রথম প্রথম মনে হতো, “এত ভালোবাসি, তবু কেন এমন হয়?” এখন বুঝি, ভালোবাসি বলেই হয়। যাকে পাত্তা দিই না, তার সাথে ঝগড়া করার দরকার কী? ঝগড়াটাই প্রমাণ যে মানুষটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু এই উপলব্ধিতে আসতে সময় লেগেছে। অনেক রাত কাটিয়েছি ঠান্ডা যুদ্ধে। অনেকবার ভেবেছি, “আমিই ঠিক, ও ভুল।” তারপর একদিন একটা জিনিস বুঝলাম—পরিবারে কেউ জেতে না। জিতলে আসলে হারা হয়। কারণ তুমি যখন জিতলে, তোমার মানুষটা হারল। আর তোমার মানুষ হারলে তুমি কীভাবে জিতলে?
এখন যখন ঝগড়া হয়, আমি একটা কাজ করি। চুপ করে যাই। না, রাগ চেপে রাখি না। শুধু সেই মুহূর্তে কথা বাড়াই না। আগুনে পানি দিলে নেভে। তেল দিলে জ্বলে। ঝগড়ার সময় কথা হলো তেল। চুপ থাকা হলো পানি।
তারপর যখন দুজনেই শান্ত, তখন কথা বলি। জিজ্ঞেস করি, “তুমি আসলে কী বলতে চেয়েছিলে?” বেশিরভাগ সময় দেখি, আমি যা বুঝেছিলাম আর ও যা বলতে চেয়েছিল—আকাশ-পাতাল তফাত।
বাবা-মায়ের ক্ষেত্রে একটু অন্যরকম। তারা পুরনো প্রজন্ম। তাদের কাছে “সরি” বলা দুর্বলতা। তাদের কাছে “আমি ভুল ছিলাম” মানে হেরে যাওয়া। কিন্তু আমি দেখেছি, বাবা যেদিন প্রথম মাকে বললেন “আমার কথায় কষ্ট পেয়ে থাকলে মাফ করো”—সেদিন মায়ের চোখে যে আলো দেখেছিলাম, সেটা কোনো গহনা দিয়ে আনা যেত না।
ক্ষমা চাওয়া দুর্বলতা না। ক্ষমা চাওয়া শক্তি। কারণ ইগো ভাঙতে সাহস লাগে।
দেয়া এখন বড় হয়েছে। গত মাসে ফোনে বলল, “ভাইয়া, বাবা-মা এখন অনেক কম ঝগড়া করে। কী হয়েছে?” আমি হাসলাম। বললাম, “বুড়ো হচ্ছে। বুড়ো হলে মানুষ বোঝে, সময় কম। রাগ করে নষ্ট করার মতো সময় নেই।”
সত্যি কথা। জীবন ছোট। আমরা ভাবি অনেক সময় আছে। কিন্তু নেই। কাল কী হবে কেউ জানে না। আজকের রাগ যদি কালকের শেষ স্মৃতি হয়ে যায়? সেই অপরাধবোধ নিয়ে বাকি জীবন কাটাতে পারবে?
আমার নানি মারা যাওয়ার আগের দিন নানার সাথে ঝগড়া করেছিলেন। ছোট কিছু নিয়ে। পরদিন সকালে নানি আর উঠলেন না। নানা পাঁচ বছর বেঁচে ছিলেন তারপর। সেই পাঁচ বছর প্রতিদিন বলতেন, “শেষ কথাটা ভালো করে বললে পারতাম।” সেই আফসোস দেখেছি আমি।
পরিবার হলো গাছের শিকড়। শিকড় না থাকলে গাছ দাঁড়ায় না। ঝড় এলে উপড়ে যায়। আমরা পরিবার ছেড়ে পালাতে পারি, রাগ করে দূরে থাকতে পারি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একা হয়ে যাই।
তাই এখন যখন ঝগড়া হয়, নিজেকে প্রশ্ন করি—এই রাগটা কি এতই গুরুত্বপূর্ণ? এই জেতাটা কি এতই দরকার? বেশিরভাগ সময় উত্তর “না।”
তখন প্রথম পদক্ষেপ নিই। গিয়ে বলি, “এসো, চা খাই।” কথা থাকে পরে। আগে পাশে বসা দরকার। কারণ পাশে বসলে মনে হয় আমরা একই দলে। মুখোমুখি দাঁড়ালে মনে হয় আমরা শত্রু।
আজ রাতে আমাদের খাবার টেবিলে কথা আছে। হাসি আছে। মাঝে মাঝে তর্ক আছে, কিন্তু সেই তর্কে বিষ নেই। এই জায়গায় আসতে অনেক সময় লেগেছে। অনেক ঝগড়া লেগেছে। অনেক শেখা লেগেছে।
পরিবার মানে পারফেক্ট মানুষদের সংসার না। পরিবার মানে ভাঙা মানুষদের একসাথে জোড়া লাগার চেষ্টা। সেই চেষ্টাটাই সবচেয়ে সুন্দর।
রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে তামান্নাকে বলি, “ভালোবাসি।” প্রতিদিন বলি। কারণ জানি না কাল বলার সুযোগ পাব কি না। এই একটা অভ্যাস আমাদের অনেক ঝগড়া থেকে বাঁচিয়েছে।
শান্তি বাইরে খুঁজে পাবে না। শান্তি ঘরে বানাতে হয়। আর সেই বানানোর কাজটা একা হয় না। সবাই মিলে করতে হয়।
একই ছাদের নিচে—এটাই আমাদের গল্প। তোমারও।
একটু ভাবনা রেখে যান