ব্লগ

নীরবতার দেয়াল ভাঙা

নভেম্বর ২০২৫ · 6 মিনিটে পড়া
শেয়ার

যে কথা কেউ বলে না

সেদিন অফিসের সিঁড়িতে রাহাত বসে ছিল। চোখ লাল। সিগারেট ধরিয়েছে, কিন্তু টান দিচ্ছে না। শুধু জ্বলছে। আমি পাশে গিয়ে বসলাম। কিছু জিজ্ঞেস করলাম না। কিছুক্ষণ পরে নিজেই বলল, “আর পারছি না ভাই।”

রাহাতের বয়স ছাব্বিশ। মতিঝিলের একটা কর্পোরেট অফিসে কাজ করে। ফ্রেশার হিসেবে ঢুকেছিল দুই বছর আগে। স্যালারি মন্দ না। কিন্তু প্রতিদিন অফিসে যাওয়ার আগে বাথরুমে বমি পায়। কেন? সেই গল্প শুনলে বুঝবে।

“বস প্রথম দিন থেকেই টার্গেট করল আমাকে,” রাহাত বলছিল। “বুঝতে পারলাম না কেন। হয়তো আমার মুখ পছন্দ না, হয়তো ইন্টারভিউতে MD সরাসরি সিলেক্ট করেছিল বলে জ্বলছিল। কিন্তু প্রথম সপ্তাহ থেকেই শুরু হলো।”

কী শুরু হলো?

“মিটিংয়ে সবার সামনে বলত, ‘এত বড় ভার্সিটি থেকে পাশ করে এটুকু পারো না?’ সবাই হাসত। আমি চুপ করে থাকতাম। পরে একা গিয়ে বলতাম, ‘স্যার, কী ভুল হয়েছে বলেন, ঠিক করি।’ উনি হাসতেন। বলতেন, ‘ভুল তো তুমি নিজেই।'”

এই কথাটা রাহাত আমাকে বলতে গিয়ে থেমে গেল। সিগারেটে একটা লম্বা টান দিল। বলল, “জানিস, শারীরিক মারধর সহ্য করা সহজ। কিন্তু প্রতিদিন প্রতিদিন শুনতে থাকা ‘তুমি অযোগ্য, তুমি কিছু পারো না, তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না’—এটা মানুষকে ভেতর থেকে শেষ করে দেয়।”

রাহাতের গল্প শুনে আমার নিজের প্রথম চাকরির কথা মনে পড়ল। তখন বুঝতাম না এটাকে কী বলে। এখন জানি—এটার নাম workplace harassment। আর এটা শুধু মেয়েদের সাথে হয় না।

ফাহিম আমার ইউনিভার্সিটির ব্যাচমেট। ব্রিলিয়ান্ট ছেলে। CGPA তিন-আট-এর উপরে। চাকরি পেয়েছিল একটা বড় গ্রুপ অফ কোম্পানিতে। ছয় মাস পরে ছেড়ে দিল। জিজ্ঞেস করলাম কেন।

বলল, “সিনিয়র একজন ছিল। প্রতিদিন আমাকে দিয়ে তার কাজ করাত। আমি না করলে বলত, ‘বস-কে বলব তুই কাজ ফাঁকি দিস।’ আমি করতাম। তারপর সেই কাজের ক্রেডিট নিজে নিত। আমি কিছু বলতে গেলে বলত, ‘ফ্রেশার তুই, চুপ থাক। নইলে confirm হবি না।'”

ফাহিম ছয় মাস সহ্য করেছে। তারপর একদিন অফিসে যেতে পারল না। শরীর সায় দিল না। এখন অন্য জায়গায় কাজ করে, কিন্তু সেই ছয় মাসের ট্রমা এখনো আছে। বলে, “এখনো কোনো সিনিয়র ডাকলে বুক ধড়ফড় করে।”

কর্মক্ষেত্রে হয়রানি বললে মানুষ ভাবে শুধু মেয়েদের ব্যাপার। ভাবে শারীরিক কিছু। কিন্তু হয়রানির হাজারটা রূপ আছে।

ক্ষমতার অপব্যবহার। “তোমার প্রমোশন আমার হাতে। বুঝে চলো।”

মানসিক অত্যাচার। সবার সামনে অপমান। কাজের ক্রেডিট কেড়ে নেওয়া। ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য দিয়ে ফাঁসানো।

সুযোগ কেড়ে নেওয়া। ভালো প্রজেক্ট থেকে বাদ দেওয়া। ট্রেনিং-এ না পাঠানো। সামনে এগোনোর রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া।

হুমকি। “চাকরি দরকার তো? তাহলে চুপ থাকো।”

আর সবচেয়ে কমন—গ্যাসলাইটিং। তুমি অভিযোগ করলে বলবে, “এত ছোট জিনিসে এত প্রবলেম? তুমি তো অনেক সেনসিটিভ।” তোমাকেই পাগল বানিয়ে দেবে।

শাকিল একটা টেক কোম্পানিতে কাজ করত। ওর টিম লিড প্রতি রাতে এগারোটা-বারোটায় কাজ পাঠাত। ডেডলাইন পরদিন সকাল। শাকিল বলত, “স্যার, একটু আগে দিলে ভালো হতো।” উত্তর আসত, “চাকরি করতে চাইলে করো, না হলে লাইনে অনেকে আছে।”

শাকিল করত। ঘুম নেই, বিশ্রাম নেই, পার্সোনাল লাইফ নেই। একদিন বুকে ব্যথা উঠল। ডাক্তার বলল অ্যাংজাইটি অ্যাটাক। বয়স? চব্বিশ।

এই গল্পগুলো কেউ বলে না। ছেলেরা বলে না। কেন? কারণ ছেলেদের দুর্বল হওয়া মানা। ছেলে মানেই শক্ত থাকতে হবে। ছেলে মানেই সব সহ্য করতে হবে। কাউকে বললেও শোনে, “এত ছোট জিনিস নিয়ে ভাবছ কেন? ইগনোর করো।”

কিন্তু ইগনোর করতে করতে মানুষ ভেঙে যায়। ভেতর থেকে ফাঁপা হয়ে যায়। একদিন দেখা যায়, সেই হাসিখুশি ছেলেটা আর হাসে না। চুপচাপ থাকে। মানুষ এড়িয়ে চলে। নিজের উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে।

তাহলে কী করা যায়?

প্রথম কাজ—বুঝতে হবে, এটা তোমার দোষ না। তুমি অযোগ্য বলে এমন হচ্ছে না। একটা toxic মানুষ তার ক্ষমতা ব্যবহার করছে তোমার উপর। এটা তার সমস্যা, তোমার না।

দ্বিতীয় কাজ—document করো। কে কখন কী বলেছে। স্ক্রিনশট রাখো। ইমেইল সেভ করো। প্রমাণ ছাড়া কেউ বিশ্বাস করবে না।

তৃতীয় কাজ—কাউকে বলো। বন্ধু হোক, পরিবার হোক, HR হোক। একা বুকে চেপে রাখলে পচে যায়।

চতুর্থ কাজ—বুঝে নাও, কোনো চাকরি তোমার মানসিক স্বাস্থ্যের চেয়ে বড় না। যদি সত্যিই অসহ্য হয়, বেরিয়ে যাওয়া লজ্জার না। হেরে যাওয়াও না।

রাহাত শেষ পর্যন্ত চাকরি বদলেছে। নতুন অফিসে গিয়ে প্রথম প্রথম ভয়ে থাকত—এখানেও কি একই হবে? কিন্তু হয়নি। সব অফিস এক না। সব বস এক না।

গত মাসে রাহাতের সাথে দেখা হলো। জিজ্ঞেস করলাম, “কেমন আছিস?” হাসল। বলল, “এখন বুঝি, আগে যা সহ্য করেছি সেটা আমার দুর্বলতা ছিল না। সেটা ছিল অভিজ্ঞতা। এখন চিনতে পারি কোনটা ভালো মানুষ, কোনটা বিষাক্ত।”

কর্মক্ষেত্রে হয়রানি একটা ক্যান্সার। এটা কোম্পানিকে খায়, মানুষকে খায়, পুরো সিস্টেমকে খায়। কিন্তু এই ক্যান্সার সারানো সম্ভব। কীভাবে? কথা বলে। চুপ না থেকে। একজন যখন মুখ খোলে, আরও দশজন সাহস পায়।

তাই এই লেখা। রাহাতের জন্য। ফাহিমের জন্য। শাকিলের জন্য। আর সেই সব ছেলেদের জন্য যারা প্রতিদিন অফিসে যায় ভয় নিয়ে, ফেরে ক্লান্তি নিয়ে, রাতে ঘুমায় দুঃস্বপ্ন নিয়ে।

তোমরা একা না। তোমাদের দোষ না।

আর একদিন ঠিকই ভালো হবে। শুধু হাল ছেড়ো না।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *