ব্লগ

দুই মায়ার লড়াই

নভেম্বর ২০২৫ · 3 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আরাশ যখন জ্বরে শুয়েছিল, তার কপালে হাত রেখে বলেছিলাম, “ভালো হয়ে যাবে।” শুধু একটা বাক্য। কিন্তু তার চোখে দেখলাম স্বস্তি। শব্দের জাদু। একটা কথায় ভয় কমে গেল, আশা জাগল।

কিন্তু সেই রাতে যখন সে ঘুমিয়ে পড়েছে, আমি নীরবে বসে তার শ্বাসের শব্দ শুনছিলাম। সেই নীরবতাতেও একটা মায়া। বাবার উপস্থিতির মায়া।

কথা আর নীরবতা—দুই ভিন্ন জাদুর খেলা।

স্ত্রী দূর দেশে বেড়াতে গেছে। ফোনে বলে, “তোমাকে মিস করছি।” একটা কথায় হাজার মাইলের দূরত্ব কমে গেল। শব্দ স্থান-কালের সীমানা ভেঙে দেয়।

কিন্তু সেই একই ফোনে যখন আমরা নীরবে থাকি, সেই নীরবতাতেও ভালোবাসা অনুভব করি। কোনো কথা নেই, কিন্তু সংযোগ আছে।

কথার জাদু তাৎক্ষণিক। নীরবতার মায়া ধীর।

বন্ধু রহিমের বাবা মারা গেছে। তার কাছে গিয়ে কী বলব? “দুঃখিত,” “সাহস রাখো,” “ভগবানের ওপর ভরসা রাখো”—সব কথাই অর্থহীন লাগল। শেষে চুপ করে পাশে বসলাম। হাত রাখলাম কাঁধে।

মৃত্যুর সামনে শব্দ অসহায়। নীরবতা শক্তিশালী।

কিন্তু জীবনে শব্দের প্রয়োজন অপরিসীম। “ভালোবাসি,” “ক্ষমা করো,” “ধন্যবাদ”—এই শব্দগুলো না বললে সম্পর্ক শুকিয়ে যায়।

শব্দ খাদ্যের মতো। নীরবতা জলের মতো। দুটোই জীবনের জন্য প্রয়োজন।

রাজনীতিবিদরা শব্দের জাদুকর। হাজার মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ করেন। কিন্তু সাধুরা নীরবতার মায়াবী। শব্দ ছাড়াই মানুষের হৃদয় ছোঁয়েন।

দুই ভিন্ন শক্তির খেলা।

প্রেমের শুরুতে শব্দের ছড়াছড়ি। “তুমি আমার জীবনের অর্থ,” “তোমার চোখে আকাশ দেখি।” কিন্তু পরিপক্ক প্রেমে নীরবতার রাজত্ব। একে অপরের পাশে চুপ করে বসে থাকতে পারা।

শব্দ আবেগ প্রকাশ করে। নীরবতা আবেগ অনুভব করায়।

আমার সবচেয়ে প্রিয় মুহূর্তগুলো নীরব। সকালের কফি খেতে খেতে জানালা দিয়ে আকাশ দেখা। আরাশ ঘুমিয়ে থাকলে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকা। স্ত্রীর সাথে সন্ধ্যায় টিভি দেখা, কিন্তু কথা না বলা।

নীরবতায় একটা পূর্ণতা আছে যেটা কথায় নেই।

কিন্তু শব্দের নিজস্ব শক্তি আছে। একটা কবিতা পড়লে মন নাড়িয়ে দেয়। একটা গান শুনলে চোখে জল আসে। একটা উপন্যাস পড়লে নিজেকে হারিয়ে ফেলি।

শব্দ কল্পনার জগৎ তৈরি করে।

তবে সবচেয়ে শক্তিশালী মুহূর্তগুলো তৈরি হয় যখন কথা আর নীরবতা একসাথে কাজ করে।

“আমি তোমাকে ভালোবাসি”—এই কথা বলার পর যে নীরবতা, সেটাই আসল জাদু। কথা বীজ বপন করে, নীরবতা গাছ বড় করে।

আমাদের সমাজ শব্দপ্রধান। সবাই কথা বলতে চায়। কিন্তু নীরবতার মূল্য কমে যাচ্ছে। অথচ সব মহৎ সৃষ্টি নীরবতা থেকেই জন্ম নেয়।

কথার জাদু ও নীরবতার মায়া—দুটোই মানুষের অপরিহার্য সম্পদ।

প্রশ্ন হচ্ছে—আমরা কোনটার সঠিক ব্যবহার জানি?

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *