ব্লগ

অন্ধকার ঘর থেকে আলোর খোঁজ

নভেম্বর ২০২৫ · 6 মিনিটে পড়া
শেয়ার

মনের ভেতরে একটা ঘর

কেউ জিজ্ঞেস করলে বলি, “ভালো আছি।” কিন্তু রাত তিনটায় সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে থাকি, আর নিজেকে জিজ্ঞেস করি—আমি কেন বেঁচে আছি?

এই প্রশ্নটা প্রথম মাথায় এসেছিল যেদিন বুঝলাম, আমার ভেতরে কিছু একটা ভেঙে গেছে। বাইরে থেকে সব ঠিকঠাক। চাকরি আছে, পরিবার আছে, বন্ধু আছে। কিন্তু ভেতরে? ভেতরে একটা অন্ধকার ঘর। সেই ঘরে আমি একা বসে থাকি। দরজা আছে, কিন্তু খুলতে পারি না। জানালা আছে, কিন্তু তাকাতে ভয় লাগে।

মানসিক অসুস্থতা এমনই। এটা চুপি চুপি আসে। রাতের মতো। তুমি টের পাও না কখন অন্ধকার নামল। হঠাৎ একদিন দেখো, চারপাশে শুধু কালো।

গত বছর আমার বন্ধু সাকিব চলে গেল। নিজেই চলে গেল। শেষবার যেদিন দেখা হয়েছিল, সে হাসছিল। আমরা চা খেতে খেতে ক্রিকেট নিয়ে তর্ক করলাম। বিদায় নেওয়ার সময় বলল, “পরে দেখা হবে।” তিন দিন পরে খবর পেলাম, সে আর নেই।

আমি এখনো বুঝি না, সেদিনের সেই হাসির পেছনে কী ছিল। কতটা কষ্ট লুকিয়ে রেখেছিল সে? কেন বলতে পারল না? কেন আমি বুঝতে পারলাম না?

এই প্রশ্নগুলো আমাকে তাড়া করে। রাতে। দিনে। সব সময়।

সাকিবের পর আমি নিজের দিকে তাকালাম। আর চমকে উঠলাম। আমার ভেতরেও তো সেই একই অন্ধকার। আমিও তো প্রতিদিন মুখোশ পরে বাইরে যাই। আমিও তো রাতে একা কাঁদি। আমিও তো ভাবি, “যদি একদিন সব শেষ হয়ে যেত।”

পার্থক্য শুধু এটুকু যে আমি এখনো এপারে। কিন্তু সীমানাটা কত পাতলা, সেটা জানি।

মানুষ মনের অসুখ বোঝে না। বোঝে কীভাবে? এটা তো দেখা যায় না। হাত ভাঙলে প্লাস্টার দেখে মানুষ বোঝে, ব্যথা আছে। কিন্তু মন ভাঙলে? বাইরে তো কোনো দাগ নেই। তাই মানুষ বলে, “এসব কিছু না। মন শক্ত করো। ঘুরতে যাও। সিনেমা দেখো।”

যেন মন শক্ত করাটা একটা সুইচ। টিপলেই অন হয়ে যাবে।

আমার মা বলেন, “বেশি বেশি নামাজ পড়ো। আল্লাহর কাছে চাও।” আমি পড়ি। চাই। কিন্তু তারপরও মাঝরাতে চোখ খুলে যায়। তারপরও বুকের ভেতরটা চেপে ধরে। তারপরও মনে হয়, আমি একটা বোঝা—নিজের কাছে, সবার কাছে।

এর মানে কি আল্লাহ শুনছেন না? না, শুনছেন। আমি বিশ্বাস করি শুনছেন। কিন্তু মনের অসুখ শুধু দোয়ায় সারে না, যেমন ডায়াবেটিস শুধু দোয়ায় সারে না। ওষুধ লাগে। চিকিৎসা লাগে। আর সেই কথাটা আমাদের সমাজ মানতে রাজি না।

সাইকোলজিস্টের কাছে গেলে মানুষ ভাবে পাগল। থেরাপি নিলে মনে করে দুর্বল। ওষুধ খেলে বলে, “ওসব নেশার জিনিস।” তাই আমরা চুপ করে থাকি। লুকিয়ে রাখি। একা একা মরি।

জানো, সবচেয়ে কঠিন কোন জিনিস? প্রতিদিন সকালে উঠে স্বাভাবিক হওয়ার ভান করা। অফিসে গিয়ে হাসা। কলিগদের সাথে গল্প করা। বাসায় ফিরে পরিবারের সাথে কথা বলা। যখন ভেতরে ভেতরে চিৎকার করতে ইচ্ছে করছে, তখন শান্ত মুখে বসে থাকা। এই অভিনয়টা প্রতিদিন করতে হয়। প্রতিটা মুহূর্তে। ক্লান্ত লাগে। এত ক্লান্ত লাগে যে মাঝে মাঝে মনে হয়, অভিনয় বন্ধ করে দিলে কেমন হয়?

কিন্তু তারপর আরাফের কথা মনে পড়ে। ও আমার ছোট ভাই। ওর কাছে আমি হিরো। ও জানে না তার হিরো রাতে বালিশে মুখ চেপে কাঁদে।

ওর কথা মনে পড়লে উঠে বসি। নিজেকে বলি, “আরেকটা দিন। শুধু আরেকটা দিন।”

মনের অসুখ নিয়ে একটা কথা কেউ বলে না—এই অসুখ তোমাকে অদ্ভুতভাবে সংবেদনশীল বানায়। তুমি অন্যের চোখের ভাষা পড়তে পারো। কে হাসির আড়ালে কাঁদছে, বুঝতে পারো। কারণ তুমি নিজে সেই পথ দিয়ে হেঁটেছ।

সেদিন অফিসে নতুন একটা মেয়ে জয়েন করল। নাম তানিয়া। সবার সাথে হাসিমুখে কথা বলছিল। কিন্তু আমি দেখলাম, ওর হাসি চোখ পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে না। লাঞ্চ ব্রেকে একা বসে ছিল। আমি পাশে গিয়ে বসলাম। কিছু বললাম না, শুধু বসলাম। কিছুক্ষণ পরে ও নিজেই বলল, “সবার সামনে হাসতে হাসতে ক্লান্ত হয়ে যাই।”

আমি বললাম, “জানি।”

এই একটা শব্দ। “জানি।” এই শব্দটার জন্য মানুষ কাঙাল থাকে। কেউ যখন বলে “জানি”—মানে সে বুঝছে, সে একা না।

মনের অসুখ থেকে বের হওয়ার রাস্তা আমি এখনো খুঁজছি। পুরোপুরি বের হতে পেরেছি বলব না। কিন্তু কিছু জিনিস শিখেছি যা একটু একটু করে সাহায্য করছে।

প্রথমত, কথা বলা। লুকিয়ে রাখলে পচে যায়। আমি একজন সাইকোলজিস্টের কাছে যাই এখন। প্রথম দিন যেতে লজ্জা লেগেছিল। মনে হচ্ছিল সবাই দেখছে। কিন্তু সেই ঘরে ঢুকে যখন প্রথমবার সব খুলে বললাম, মনে হলো বুকের উপর থেকে একটা পাথর সরে গেছে।

দ্বিতীয়ত, নিজেকে ক্ষমা করা। আমি পারফেক্ট না। হওয়ার দরকার নেই। মাঝে মাঝে ভেঙে পড়া অপরাধ না। মাঝে মাঝে কাঁদা দুর্বলতা না। মাঝে মাঝে সাহায্য চাওয়া লজ্জার না।

তৃতীয়ত, ছোট ছোট জিনিসে আনন্দ খোঁজা। সকালের এক কাপ চা। বিকেলের হাওয়া। একটা ভালো গান। এগুলো ছোট, কিন্তু এই ছোট মুহূর্তগুলোই আসলে জীবন।

আর সবচেয়ে বড় কথা—প্রতিদিন নিজেকে বলা, “আজকেটা পার করো। কালকের কথা কাল ভাববে।”

মনের অসুখ কোনো পাপ না। এটা জ্বরের মতো একটা অসুখ। জ্বর হলে যেমন দোষ নেই, মনের অসুখেও দোষ নেই। শুধু চিকিৎসা দরকার। যত্ন দরকার। সময় দরকার।

আমি জানি, কাল হয়তো আবার খারাপ দিন আসবে। সেই অন্ধকার ঘরে আবার ফিরে যেতে হবে। কিন্তু আমি এটাও জানি, সেখান থেকে আবার বের হওয়া যায়। কারণ আগেও বের হয়েছি।

সাকিব পারেনি। কিন্তু সাকিবের জন্য আমি চেষ্টা করব। ওর হয়ে বেঁচে থাকব।

যদি তুমি এটা পড়ছ, আর তোমার ভেতরেও একটা অন্ধকার ঘর আছে—জেনে রাখো, তুমি একা না। আমরা অনেকে আছি এই ঘরে। আর একদিন, একসাথে, আমরা দরজাটা খুলব।

সেদিন পর্যন্ত—শুধু আরেকটা দিন। শুধু আরেকটা দিন।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *