আজ সকালে বাসে উঠতে পাঁচ সেকেন্ড দেরি হলো। জুতার ফিতা খুলে গিয়েছিল। বাঁধতে গিয়ে বাস চলে গেল। পরের বাসে উঠলাম।
এই পাঁচ সেকেন্ড দেরি একটা সম্পূর্ণ ভিন্ন দিন তৈরি করল। পরের বাসে এক পুরনো বন্ধুর সাথে দেখা। সে নতুন চাকরির খবর দিল। ফলে আমার আজকের পুরো প্রোগ্রাম বদলে গেল।
ভাবতেই অবাক লাগে—একটা জুতার ফিতা আমার ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে।
বাসায় ফিরে হ্যাপিকে বললাম, “তুমি জানো, আমাদের পুরো জীবনটা কয়েক সেকেন্ডের উপর নির্ভর করে?”
“কী বলছো?”
“আমি যদি আজ ঐ বাস ধরতাম, তাহলে এই চাকরির খবর পেতাম না।”
হ্যাপি বলল, “তাহলে?”
“তাহলে ছোট ঘটনার বিশাল প্রভাব।”
আমি ভাবলাম—আমার পুরো জীবনে এরকম কতগুলো মুহূর্ত আছে? যেগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে নিয়ে গেছে।
হ্যাপির সাথে প্রথম দেখা। সেদিন আমি যদি কলেজে না যেতাম? যদি লাইব্রেরির বদলে ক্যান্টিনে যেতাম? তাহলে কি আমরা কখনো দেখা হতো?
একটা বই ফেরত দিতে গিয়ে হ্যাপির সাথে দেখা। সেই বইটা যদি আমি আগের দিন ফেরত দিতাম? বা পরের দিন? তাহলে কি আরাশের জন্ম হতো?
আরাশকে ডেকে বললাম, “তুমি জানো, তুমি প্রায় জন্মাতে পারতে না?”
“কেন?”
“তোমার মা আর আমার দেখা হওয়াটা ছিল দুর্ঘটনা। একটা বই ফেরত দেওয়ার কারণে।”
আরাশ হেসে বলল, “তাহলে ঐ বইটা আমার জন্মদাতা?”
আমি অবাক হলাম। আরাশ ঠিক বলেছে। একটা বই আমার ছেলের জন্মের কারণ।
আমি আরো ভাবলাম। আমার প্রথম চাকরি। সেদিন ইন্টারভিউতে যাওয়ার পথে ট্রাফিক জ্যামে পড়েছিলাম। দেরি হয়েছিল। ভেবেছিলাম সব শেষ। কিন্তু ইন্টারভিউয়ার নিজেও দেরি করেছিলেন। ফলে সব ঠিক হয়ে গেল।
সেই ট্রাফিক জ্যাম যদি না হতো? তাহলে আমি সময়মতো পৌঁছে অপেক্ষা করতাম। হয়তো অস্থির হয়ে যেতাম। হয়তো ইন্টারভিউ খারাপ হতো।
তাহলে সেই ট্রাফিক জ্যাম আমার বন্ধু ছিল, শত্রু নয়।
জামিউরের সাথে ফোনে এই নিয়ে কথা হলো। “এটাকে বলে বাটারফ্লাই ইফেক্ট,” সে বলল।
“কী?”
“আমাজনে একটা প্রজাপতি ডানা ঝাপটালে টেক্সাসে ঝড় হতে পারে।”
আমি অবাক হলাম। “সত্যি?”
“তত্ত্বের কথা। ছোট কারণ, বড় ফলাফল।”
আমি বুঝলাম—আমার জীবনও এরকম। প্রতিদিন হাজারো প্রজাপতি ডানা ঝাপটাচ্ছে। প্রতিটা ডানার ঝাপটানি আমার ভবিষ্যৎ বদলে দিচ্ছে।
সন্ধ্যায় ভাবলাম—আমার বাবার মৃত্যু। সেদিন সকালে তিনি অফিসে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মা বলেছিলেন, “একটু সর্দি হয়েছে। বাসায় থাকো।” তিনি মায়ের কথা শুনলেন। কিন্তু দুপুরে হার্ট অ্যাটাক।
যদি তিনি অফিসে যেতেন? হয়তো হাসপাতাল কাছে পেতেন। হয়তো বেঁচে যেতেন।
একটা সর্দি। একটা পরামর্শ। একটা সিদ্ধান্ত। পুরো পরিবারের ভাগ্য বদলে গেল।
কিন্তু তারপর ভাবলাম—এই ঘটনা আমাকে আরো দায়িত্বশীল করেছে। তাড়াতাড়ি কাজে ঢুকতে হয়েছে। পরিবারের দেখভাল করতে হয়েছে। হয়তো এর কারণেই হ্যাপি আমাকে বিয়ে করতে চেয়েছে। আমার মধ্যে পরিপক্বতা দেখেছে।
তাহলে বাবার মৃত্যু দুঃখের হলেও আমার জীবনে নতুন দিক খুলে দিয়েছে।
রাতে শুয়ে আরো ভাবলাম। আমার এই মুহূর্তের চিন্তাও কি ভবিষ্যৎ বদলে দিচ্ছে? আমি যে এই প্রশ্নগুলো করছি, এর কি কোনো প্রভাব পড়বে?
হয়তো কাল এই চিন্তার কারণে আমি একটু আলাদা আচরণ করবো। সেই আচরণ অন্য কারো উপর প্রভাব ফেলবে। সেই প্রভাব আরো কারো কাছে যাবে।
এভাবে একটা চেইন রিঅ্যাকশন।
আমার মনে পড়ল গতকালের ঘটনা। পথে একটা ভিখারিকে দশ টাকা দিয়েছিলাম। সে খুশি হয়ে দোয়া করেছিল। হয়তো তার সেই ভালো মুড অন্য কাউকে সাহায্য করতে প্রেরণা দিয়েছে।
হয়তো আমার দশ টাকা কয়েক হাত ঘুরে কারো জীবন বাঁচিয়েছে।
কিংবা আমি যেদিন রাগ করে হ্যাপির সাথে খারাপ কথা বলেছিলাম। হ্যাপির মুড খারাপ হয়েছিল। হয়তো সে আরাশের সাথে একটু কড়া কথা বলেছে। আরাশের মন খারাপ হয়েছে। সে স্কুলে বন্ধুদের সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে।
এভাবে আমার একটা রাগ অনেক মানুষের দিন খারাপ করেছে।
আমি বুঝলাম—আমার প্রতিটা কাজ, প্রতিটা কথা, প্রতিটা ভাবনা ক্যাওসের অংশ। আমি চাই বা না চাই, আমি প্রভাব ফেলছি।
তাহলে আমার দায়িত্ব হলো—ভালো প্রভাব ফেলার চেষ্টা করা।
আমি যদি একটু বেশি হাসি, হয়তো কেউ খুশি হবে। সে অন্য কাউকে খুশি করবে। এভাবে আমার হাসি পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে যাবে।
আমি যদি একটু বেশি দয়া দেখাই, হয়তো কেউ অনুপ্রাণিত হবে। সেও দয়া দেখাবে। এভাবে আমার দয়া একটা ঢেউ তুলবে।
পরদিন সকালে উঠে একটা সিদ্ধান্ত নিলাম। আজ আমি সচেতনভাবে ভালো প্রভাব ফেলার চেষ্টা করবো।
বাসে একজন বয়স্ক মানুষকে সিট ছেড়ে দিলাম। তিনি খুশি হলেন। হয়তো এই খুশিটা তিনি বাসায় নিয়ে যাবেন।
দোকানদারকে একটু বেশি পয়সা দিলাম। “রাখেন, কাজে লাগবে।” তার মুখে হাসি ফুটল। হয়তো সে আজ অন্য কাস্টমারদের সাথে ভালো ব্যবহার করবে।
আরাশকে একটু বেশি আদর করলাম। তার মুড ভালো হলো। হয়তো সে স্কুলে বন্ধুদের সাথে ভালো থাকবে।
এই ছোট ছোট কাজগুলো করতে গিয়ে মনে হলো—আমি একটা সুন্দর ক্যাওস তৈরি করছি।
জীবনে ক্যাওস অবধারিত। কিন্তু আমি চাইলে সেই ক্যাওসের দিক নির্ধারণ করতে পারি।
আমি চাইলে ভালো প্রজাপতি হতে পারি। যার ডানার ঝাপটানি সুন্দর ঝড় তোলে।
একটু ভাবনা রেখে যান